বন্যা-পরবর্তী বাংলাদেশে শাকসবজির বাম্পার ফলন হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব পণ্যের দাম তাই বর্তমানে অনেক কম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সবজির উৎপাদন ব্যয়ও তুলতে পারছেন না কৃষক। বাজারে দেশী পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৪০ টাকা কেজিতে। টমেটো কিংবা আলুর মতো সবজিও বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকার কম দামে। যদিও গত বছরের এ সময় ১২০ টাকা কেজি কিনতে হয়েছে পেঁয়াজ। আর আলুসহ সব ধরনের সবজির দামও ছিল বেশ চড়া।
শাকসবজির বড় দরপতনের প্রভাবে দেশে মূল্যস্ফীতির হারও কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) থেকে গতকাল জানানো হয়, ফেব্রুয়ারিতে দেশের গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। জানুয়ারিতে এ হার ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ ছিল। বিবিএসের তথ্যেও সবজির দাম কমার প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, এর ফলে গত মাসে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২৪ শতাংশে নেমেছে। যেখানে গত বছরের মার্চের পর খাদ্যের মূল্যস্ফীতি আর এক অংকের ঘরে নামতে দেখা যায়নি।
এদিকে বিবিএসের দেয়া তথ্য আমলে নিলেও ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল গোটা দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ। শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতির হার গত মাসে ছিল ঋণাত্মক ৪ দশমিক ২০ শতাংশ (-৪.২০%)। টানা ছয় মাস ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্রটির মূল্যস্ফীতি ঋণাত্মক ধারায় রয়েছে। অথচ দুই বছর আগে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করা দেশটির মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল।
শ্রীলংকার মতোই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নজিরবিহীন সাফল্য পেয়েছে পাকিস্তান। ফেব্রুয়ারিতে দেশটির মূল্যস্ফীতির হার ১ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে, যা নয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি ২০২৩ সালের এপ্রিলেও ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়া এ দুটি দেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মূল্যস্ফীতির হারও বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। এর মধ্যে গত মাসে ভারতের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৪ দশমিক ৩১ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, গত তিন মাসে শীতকালীন শাকসবজির দাম কমার প্রভাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তবে সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া কোনো পদক্ষেপ এতে ভূমিকা রাখেনি। এ কৃতিত্ব শতভাগই এদেশের কৃষকের। এর মধ্যে সরকার যদি অন্যান্য পণ্যের দামের লাগাম টেনে ধরতে পারত, তাহলে মূল্যস্ফীতি আরো অনেক কমে আসত।
ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসাকে ‘সিজনাল ইফেক্ট’ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এ নির্বাহী পরিচালক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৃষকরা বিপুল পরিমাণ শীতকালীন শাকসবজির চাষ করেছেন। বাজারে সেগুলোর পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল। এ কারণে দাম কমে গেছে। এটি সিজনাল ইফেক্ট। এ ধরনের ইফেক্ট বা প্রভাব খুবই কম সময় থাকে। আগামীতে সরবরাহ নিশ্চিত না হলে শাকসবজির দাম আবারো বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’
সেলিম রায়হান আরো বলেন, ‘আমরা এতদিন ধরে বলে আসছি, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহ ঘাটতির কারণে হচ্ছে। সবজির দাম কমে যাওয়ার ঘটনা আমাদের দাবিকেই সমর্থন করে। তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে চেষ্টা করেছে, সেটির ফল কই? আমরা তো দেখছি, বাজারে চাল, ডাল, মাছ-মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো পণ্যের দাম কমেনি। বরং অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে। সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর ফর্মুলা সঠিক হলে বাজারে এসব পণ্যের দাম কমার কথা ছিল। আমি বলব, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সংশোধনের এখনো সময় আছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সহায়ক মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি প্রণয়ন করে সংকটের সুরাহা করতে হবে।’
দেশে তিন বছরের বেশি সময় ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এর মধ্যে গত দুই অর্থবছরজুড়েই গড় মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের বেশি। বিবিএসের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম মাস তথা জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ওই মাসে মূল্যস্ফীতির হার ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে আসে বলে দাবি করে বিবিএস। এরপর সেপ্টেম্বরে আরো কিছুটা কমে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ দেখানো হয়। তবে অক্টোবর ও নভেম্বরে এ হার আবারো ঊর্ধ্বমুখী হয়। অক্টোবরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার দেখানো হয় ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। নভেম্বরের এ হার ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশে ঠেকে। এরপর ডিসেম্বরে মূলস্ফীতি ১০ দশমিক ৮৯ ও জানুয়ারিতে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে নেমে আসে বলে বিবিএস থেকে জানানো হয়।
[Disclaimer: You may visit the news source: https://www.bonikbarta.com/]

