Beta Ver. 0.04
Tuesday, June 2, 2026
Homeঅন্যান্যঅভিভাবকমহল ও শিক্ষা

অভিভাবকমহল ও শিক্ষা

ড. মোহীত উল আলম

আমার এক চৌকস দুলাভাই ছিলেন, যিনি তার ছেলেমেয়েদের সব সময় একটা কথাই বলতেনÑ ‘পড়, পড়, পড়!’

এটা আমাদের পরিবারে হাসির খোরাক জোগালেও কিন্তু আমাদের সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার ধাঁচ ছিল আগে এটা এবং এখনও আছে। বাসাবাড়িতে পাড়ায় পাড়ায় এবং গ্রামে গ্রামে বাবা-মা বা পরিবারের গুরুজনরা স্কুলগামী সন্তানদের আমার দুলাভাইয়ের মতোই বলতেন ‘পড়, পড়, পড়!’ সন্ধ্যা হলেই গলিতে গলিতে হাঁটলে বাসাবাড়ির জানালা দিয়ে দেখা যেত বা বেড়ার বাইরে শোনা যেত শিশুরা শোর করে পড়ছে। শরৎচন্দ্রের ‘নতুন দা’ শীর্ষক রচনায়ও এই পাঠাভ্যাসের কথা আছে।

এটা যে এমনি এমনি হতো তা নয়, কারণ অভিভাবক মহল মনে করতেন এবং এখনও মনে করেন যে, ছেলেমেয়েরা রেগুলার পড়াশোনা করবে এবং তাদের মেধার পরিচয় দেবে, একের পর এক ক্লাসের পর ক্লাস পার করে এক সময় একটা ভালো চাকরিতে ঢুকবে, সরকারি চাকরি হলে কথা নেই, সেটি না হলেও অন্য একটা ভালো চাকরিতে ঢুকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। ছেলে হলে বিয়েশাদি করে সংসার জীবনে ঢুকবে, আর মেয়ে হলে শিক্ষার একটা পর্যায় শেষ করার পর তার বিয়েশাদি, চাকরিবাকরিতে ঢোকার ব্যবস্থা মেনে নেওয়া হবে।

পোষ্যদের নিয়ে অভিভাবকদের এটি শুধু যে একটি নিয়মিত রুটিন ছিল তা নয়, পোষ্যদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে তারা তাদের স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখতে চাইতেন। ছেলেমেয়ের স্কুল-সাফল্যে বাবা-মায়ের মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠত বা আনন্দে ভেসে উঠত। আমার এক বন্ধু আছে বা তার মতো কোটি কোটি অভিভাবক আছেন যাদের শুধু নিজের ছেলেমেয়েদের স্কুল, কলেজের বা এসএসসি, এইচএসসির পরীক্ষায় পাওয়া নম্বর মনে আছে তা নয়, পাড়া-প্রতিবেশীর বা নিকট-আত্মীয়স্বজনের ছেলেমেয়েদের অর্জিত নম্বরও মনে আছে।

আমাদের দেশে গত একশ বছর বা বাংলাদেশে গত পঞ্চাশাধিক বছর লেখাপড়ার মান কী ছিল, বা কী হতে পারত, পরীক্ষা পদ্ধতি কী কী হতে পারত কিংবা আরও কী কী করা যায় এসব বিষয়কে অ্যাড্রেস করার জন্য আমি এই লেখাটা ফেবুর বন্ধুদের জন্য লিখছি না, লিখছি এই কথাটা বলার জন্য যে, অভিভাবকদের তরফ থেকেÑ কৃষাণ থেকে শুরু করে রিকশাওয়ালা, তরকারি বিক্রেতা, দিনমজুর, চাকরিরত, ব্যবসারত, আরও বিভিন্ন পেশার ছোট-বড় পদের যত অভিভাবক আছেন তাদের সবার মনে নিত্যজাগরূক হলো একটি দুর্মর স্বপ্ন যে ছেলেমেয়েরা ভালো লেখাপড়া করে বাবা-মাসহ সমাজের মুখ উজ্জ্বল করবে।

ডিজিটাল যুগে এসে অনলাইন সুযোগ-সুবিধার কারণে লেখাপড়ার ভোল পাল্টেছে, রকমসকম বদলেছে; কিন্তু ছেলেমেয়ে লেখাপড়ায় ভালো করবে, প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবেÑ এই প্রপঞ্চের কোনোদিন মৃত্যু হয়নি।

একটা যুক্তি আমি এই লেখায় ইচ্ছা করে আনছি না, সেটা হলো চরম মেধাবী হয়ে লেখাপড়ায় ভালো করে বড় চাকরি করে মা-বাবাকে ভুলে যাবে সেই কিসিমের ব্যতিক্রমের কথা আমি এখানে আনছি না। বরং আমি আনছি সিংহভাগ অভিভাবকের মনে যে গূঢ় ইচ্ছা সন্তান-সন্ততি নিয়ে তার প্রতিফলন যে তারা দেখতে চায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায়, আমি সেই অ্যাঙ্গেল থেকে যুক্তির বিস্তার করছি। দ্বিতীয়ত, আমি এই চিন্তাটাও এখানে আনছি না যে শুধু পাঠ্যবই পড়ে, কিন্তু মানুষ বা জীবনকে না পড়ে যে ডিগ্রি পাস হওয়া গেলেও শিক্ষিত ও মানবিক হওয়া যায় না, সে চিন্তাও আমি এখানে আনছি না। আমি বরং সরলভাবে অভিভাবকদের স্বপ্নটার কথা মনে করিয়ে দিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। তৃতীয়ত, আমি এই প্রকরণও আলোচনায় আনছি না যে, প্রতিভাবান ছেলেমেয়েরা পরীক্ষার আগের রাতে পড়েও ফার্স্ট ক্লাস পায়, কেউ কেউ জেলখানায় থেকে পরীক্ষা দিয়ে প্রথম শ্রেণি পেয়েছে বা পায়, তাদের কথাও আমি এই আলোচনায় রাখছি না।

চতুর্থত, আমি একটি মিথ ভেঙে তার পর আমার মূল বক্তব্যে যাব। সে মিথটা হলো, শিক্ষাঙ্গনে সক্রিয় রাজনীতি শিক্ষার্থী আর শিক্ষকরা করবে কি না! আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখেছি এটি মোটেও শিক্ষাঙ্গনের জন্য প্রয়োজনীয় নয়। এটা সত্য যে, ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের দেশে ছাত্রছাত্রীর রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। অনলাইনের যুগে সারা বিশ্ব একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে, সেখানে আমাদের ছেলেমেয়েরা এখন শুধু নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করছে তা নয়, বহির্বিশ্বে তাদের সমবয়স্কদের সঙ্গেও তারা প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কাজেই শিক্ষাঙ্গনগুলো নিচে থেকে ওপর পর্যন্ত যেন জ্ঞানতাপসকেন্দ্র হয়ে ওঠে সেদিকে সরকার, অভিভাবকমহল এবং সংশ্লিষ্ট সবার মনোযোগ দেওয়া উচিত ‘বাড়ির কাজ’ এক নম্বর হিসেবে। পঞ্চমত, আরেকটি বক্তব্য খণ্ডন করে আমি আমার মূল বক্তব্যে যাব। সেটি হলো এই যে, একজন কৃষক অবশ্যই ধান বোনার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষিত কর্মী, কিন্তু তাকে ধান বিশেষজ্ঞ বলা যাবে না। কারণ যিনি বিশেষজ্ঞ তিনি জানবেন কোন কোন ধান কোন কোন জমির জন্য ভালো, কোন দেশের ধানের সঙ্গে বাংলাদেশের ধানের প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। বাংলাদেশ যে কৃষিব্যবস্থায় বিস্তর উন্নতি করেছে তার পেছনে শিক্ষিত কৃষিবিজ্ঞানীদের অবদান ব্যাপক। এই কৃষির সূত্র ধরে আমি আমার মূল বক্তব্যে আসতে চাই।

জুলাই-আগস্ট মাসের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রতিটা মুহূর্ত কোটি কোটি জনগণের মতো আমিও টিভি এবং পত্রপত্রিকার মাধ্যমে নিবিড়ভাবে অনুসরণ করছিলাম। এবং এই আন্দোলনের অগ্রসরমানতা ও পরিণতির সব পর্যায়ে ক্রমেই লক্ষ করছিলাম যে, ব্যাপকভাবে অপত্যস্নেহের কারণে হোক বা নিজেদের ভেতরে বৈষম্যবিরোধী চেতনার ফলে হোক কিংবা শিক্ষার সংকটের কথা চিন্তা করে হোক, লাখ লাখ অভিভাবক, বিশেষ করে বাবা-মা অংশগ্রহণ করেছিলেন।

অভিভাবকদের এই প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের পেছনে আমি আমার প্রয়াত দুলাভাইয়ের ‘পড়, পড়, পড়’ আহ্বানের অনুরণন দেখতে পাই। কারণ দলীয় রাজনীতির অশিক্ষাসুলভ আধিপত্যের ফলে বলা যায় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জীর্ণশীর্ণ, ছেঁড়াবেড়া অবস্থায় অভিভাবকমহল শঙ্কিত হতে হতে, অস্থির হতে হতে, নিজেদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ভবিষ্যৎ কী হবে, আবরারের মতো একটি জলজ্যান্ত ছেলেকে সবচেয়ে মেধাবী প্রতিষ্ঠানের সহপাঠীরাই রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে পিটিয়ে মেরে ফেলল এবং সে রকম আরও হাজারো উৎপাতের কারণে অভিভাবকমহলে বিপ্লবের সাড়া পড়ে যায় প্রতিবাদ হিসেবে।

আমরা সবাই অভিভাবক মহলের সাধারণ সামাজিক কথাবার্তার সঙ্গে পরিচিত। অভিভাবকরা দৃষ্টান্ত দিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। যেমন আমি যখন স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ি, তখন আমার কয়েক বছরের বড় আপন চাচাতো ভাই ঢাবিতে অর্থনীতিতে ভর্তি হন। তার মুখে সব সময় তার একজন সহপাঠী খুবই উজ্জ্বল মেধার অধিকারী, যিনি কোনোদিন কোনো পরীক্ষায় প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হননি, তার গল্প করতেন। ভাইয়ের সে সহপাঠী এখন অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা। কিন্তু তার রেফারেন্স বারবার আমাকে যে শিক্ষাজীবনে উদ্বুদ্ধ করেনি সে কথা বলা যাবে না।

এভাবে অভিভাবকমহল সব সময় চায়, তাদের ছেলেমেয়েদের সামনে যেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত থাকে। কিন্তু অভিভাবকমহল দশকের পর দশক এ ক্ষেত্রে অর্থাৎ শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক দুরবস্থা দেখে হতাশার তলায় পৌঁছায়। কারণ তাদের চোখে রাজনৈতিক অর্বাচীনতার কোনো স্থান নেই। অযোগ্য, মেধাহীন, স্বাথর্পর, ক্ষেত্র বিশেষে অশিক্ষিত এবং দুর্নীতিবাজ শাসকমহলের সদস্যদের কখনও অভিভাবকমহল তাদের ছেলেমেয়েদের কাছে দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরতে চাইবেন না

সে জায়গায় বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান একজন নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি, সারা বিশ্বে পরিচিত, পেশায় অধ্যাপক এবং খুবই মেধাবী, উচ্চডিগ্রিধারী, উদ্ভাবনী শক্তি ও উদ্যমে ভরপুর এবং কথাবার্তায় যুক্তিবাদী ও দৃঢ়প্রত্যয়ী, তাকে আমি যে কারণগুলো ব্যাখ্যা করলাম, তার আলোকে অভিভাবকমহল তাদের সন্তানদের সামনে অনুসরণীয় দৃষ্টান্তস্বরূপ তুলে ধরার অবকাশ আছে বলে আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়।

দেশ ও জাতির উন্নতি হোক।

ড. মোহীত উল আলম : শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক

[ Disclaimer: You may visit the news source-https://www.dainikamadershomoy.com/]

অনুরূপ সংবাদ
- Advertisment -

আরও খবর