মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ধরাশা হয়েছেন কমলা হ্যারিস। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জন্যও বেশ লজ্জাজনক ফল বলা যায়। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে রিপাবলিকান পার্টি। ডেমোক্র্যাটদের পরাজয় নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। ডেমোক্র্যাটদের পরাজয়ের পেছনে কোন কারণটা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে হাজির হয়েছে। যে কারণগুলো উঠে আসছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, ডেমোক্র্যাটদের ভরাডুবির পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। করোনা মহামারী-উত্তর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়ায় থাকলেও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পৃথিবীব্যাপী মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউক্রেন ও ন্যাটোকে প্রধান অর্থ সহায়তাকারী দেশ হিসেবে প্রচুর অর্থ ঢালতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতাও তাতে ঘি ঢেলে দিয়েছে। ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকেও প্রচুর অর্থসহায়তা দিতে হয়েছে। এর প্রভাব যে মার্কিন অর্থনীতিতে পড়েছে তা সহজেই অনুমেয়।
যুক্তরাষ্ট্র হোক কিংবা বাংলাদেশ হোক, সাধারণ মানুষ তাদের সরকারকে বিচার করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে কিনা তা দিয়ে। নির্বাচনে জয়লাভের জন্য বাজার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। গত চার বছরে, ডেমোক্র্যাটরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, চার বছরের মধ্যে যদি তিন বছরও দ্রব্যমূল্যের দাম স্বাভাবিক থাকে এবং চতুর্থ বছরে দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধি পায়, তখনো জনগণ শেষ বছরের কথাই মনে রাখে। ২০২০ সালে যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ১ দশমিক ২ শতাংশ, ২০২৩ সালে তা হয় ৪ দশমিক ১ শতাংশ। যদিও ২০২৪-এ তা ২ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়ায়, তবুও মার্কিনরা ২০২৩ সালের দগদগে স্মৃতিই মনে রেখেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির একটা উদাহরণ দিচ্ছি, সুপারশপে এক জার মেয়োনিজের দাম এখন ৯ ডলার, যেটা ২০২০ সালের থেকে এখন ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। ডিম ও দুধের দাম বেড়েছে, বিশেষ করে ২০২০ থেকে ২০২৪-এ ডিমের দাম বেড়েছে ৯৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে ২০২০ থেকে ২০২৪-এ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ২১ শতাংশ ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালেই বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। (তথ্য সূত্র: কৃষি মন্ত্রণালয়, যুক্তরাষ্ট্র)।
রয়টার্স একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করছে, সেখানে পুল ফেরত ভোটারদের জরিপে দেখা যাচ্ছে, ৫১ শতাংশ নাগরিক বলেছে, হ্যারিসের চেয়ে ট্রাম্প অর্থনীতি ভালো পরিচালনা করবেন। অন্যদিকে ৪৭ শতাংশ নাগরিক বলেছেন হ্যারিস ট্রাম্পের চেয়ে ভালো করবেন। আর যেসব ভোটারের জন্য দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সবচেয়ে বড় বিষয় তারা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছে এবং এ সংখ্যা হলো ট্রাম্প ৭৯ শতাংশ ও হ্যারিস ২০ শতাংশ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং খারাপ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা যে ডেমোক্র্যাটদের ভরাডুবির কারণ হয়েছে তার আভাস পাওয়া যায় বর্ষীয়ান ডেমোক্র্যাট নেতা, বার্নি স্যান্ডার্সের কথায়। তিনি বলেছেন, ডেমোক্রেটিক পার্টি, কর্মজীবী মানুষকে ত্যাগ করেছে, তাই ডেমোক্রেটদের এ ভরাডুবি। যদিও ধনীরা ভালো করছে তবে ৬০ শতাংশ কর্মজীবী আমেরিকান মাস শেষে বেতনের আশায় দিন গুনছে। এ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে জনমতের প্রভাব আমরা বাংলাদেশেও এখন দেখতে পাচ্ছি। আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা মোটামুটি স্বাভাবিক থাকার পরও প্রতিনিয়ত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অন্তর্বর্তী সরকারকে সমালোচনার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ছাড়াও আরেকটা লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, কমলা হ্যারিস সবচেয়ে বড় যে ভুল করেছে। সে নিজেকে জো বাইডেনের চেয়ে পৃথক প্রমাণ করতে পারেননি। বাইডেনের এজেন্ডা নিয়ে কমলা নির্বাচন করেছেন এবং ফলাফল হিসেবে বাইডেনের ভুলের মাশুল কমলাকে দিতে হয়েছে। এছাড়া বাইডেন অনেক দেরিতে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। মূলত ট্রাম্পের সঙ্গে প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে খারাপ করার পর সে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। কমলার হয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর জন্য ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
সর্বশেষ ফিলিস্তিন-ইসরায়েল যুদ্ধ অনেক বড় প্রভাব বিস্তার করেছে। ডেমোক্র্যাটদের ফিলিস্তিন নিয়ে ধোঁয়াশার কারণে অনেক মুসলিম ভোটদান থেকে বিরত ছিলেন। মূলত মুসলিমরা সাধারণত ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেয়। এমনকি মিশিগানেও ডেমোক্র্যাটরা জিততে পারেনি। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে মিশিগানের পরিচিতি আছে। ২০২০ সালে মিশিগানে বাইডেন জয়লাভ করেছিলেন। এবার শেষ রক্ষা হলো না। এর সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধও ভূমিকা পালন করছে। অনেক আমেরিকান নাগরিক মনে করেছেন, ডেমোক্র্যাটরা তাদের থেকে ইউক্রেন নিয়ে বেশি মাথা ঘামাচ্ছে। যেখানে খোদ যুক্তরাষ্ট্রই নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ইউক্রেনে অকাতরে অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি মার্কিন ভোটাররা ভালো চোখে দেখেনি।
সানজিদা বারী: পিএইচডি শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগো
[Disclaimer: You may visit the news source: https://bonikbarta.net/]

