বর্তমানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশে নারীদের সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করলে দেখা যায় ধারাবাহিকভাবে নারীদের প্রতি নির্যাতনের বিচারহীনতা, নিরাপত্তার অভাব এবং সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলোর ক্রমাগত বিদ্বেষমূলক প্রচারণা নানাভাবে নারীদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে এসব ঘটনা বেশি ঘটেছে। বিশেষ করে নারী সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত সম্পত্তির অধিকারের সমতা এবং ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধির দাবির মুখে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো সমবেতভাবে যেভাবে নারী আন্দোলনকে আক্রমণ করেছে এবং সমাবেশ ডেকে নারীদের সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছে, তা নারী অধিকারের লড়াইকে এক বড় ধরনের হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এসব সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানই নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার ৩ দশমিক ৯৪ শতাংশে নেমে আসা এবং নারীর অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
প্রধানত, এ সংকটের মূলে রয়েছে গত ৫৫ বছরের দেশের শাসন ব্যবস্থার ধরন। যারা দেশ শাসন করেছেন, তারা নারীদের জন্য বৈষম্যমূলক আইনগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, নারী নির্যাতনকারীদের প্রশ্রয় দিয়েছেন এবং একটি নিরাপদ বিকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক উত্থান, ফলে নারীদের যাত্রা ভয়ংকরভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বর্তমান সময়েও নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় উপদ্রব হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও ইন্টারনেটে সাইবার বুলিং। এ সহিংসতা প্রতিরোধে আমাদের ইশতাহারে আমরা ‘র্যাপিড অ্যাকশন সেল’ গঠন এবং হেল্পলাইনগুলোকে সক্রিয় করার দাবি জানিয়েছি, যাতে নির্যাতিতরা দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনি সহায়তা পায়। এছাড়া পাড়ায় পাড়ায় সাংস্কৃতিক আয়োজন, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং নারীদের জন্য আত্মরক্ষামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করার মতো জরুরি দাবিগুলোও আমরা ইশতাহারে রেখেছিলাম এবং নারীদের প্রতি সহিংসতার সামাজিক বাস্তবতা মেনে এসব কর্মকাণ্ড দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানাই।
নবগঠিত সরকার ও দেশে বিদ্যমান সব রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমাদের প্রত্যাশা—কেবল লোক দেখানো সংস্কার নয়, বরং নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং সম্পত্তিতে সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নারী-পুরুষে বিভক্ত করে ব্যক্তিগতভাবে আলাদা আইনের পরিবর্তে একটি ইউনিফর্ম সিভিল কোড চালু করতে হবে। বিবাহ রেজিস্ট্রেশন ও সন্তানের অধিকারে নারীদের জন্য সমতা আনাও এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি ওয়াজ মাহফিল বা রাজনৈতিক সমাবেশ থেকে যে নারী বিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক বক্তব্য ছড়ানো হয়, তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব না হলে নারীরা প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকতর হতে থাকবে।
ডা. মনীষা চক্রবর্তী: বাসদ নেতা ও বিগত নির্বাচনে বরিশাল-৫ আসনের প্রার্থী
[Disclaimer: You may visit the news source-bonikbarta.com]

