Beta Ver. 0.04
Saturday, September 12, 2026
Homeসহযোগী সংবাদমাধ্যমবণিক বার্তাইউরোপীয় শিল্পীদের চোখে বাংলা

ইউরোপীয় শিল্পীদের চোখে বাংলা

আহমেদ দীন রুমি

পলাশীর আম বাগানে ১৭৫৭ সালে কেবল বাংলার রাজনৈতিক ভাগ্য রচিত হয়নি, রচিত হয়েছে এখানকার সাংস্কৃতিক গতিপথও। আঠারো শতকের শেষভাগেই রাজনৈতিক আনুকূল্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলায় আসতে শুরু করেন ইউরোপীয় শিল্পীরা। আগে মোগল ও সুলতানি ঘরানার চিত্রকলা বাংলার ঐতিহ্যের অনুষঙ্গ হিসেবে থাকলেও এবার প্রাধান্য বিস্তার করে পশ্চিমা বাস্তবতা। পরিবর্তন শুরু হয় শিল্পে রঙের ব্যবহার, বিষয়বস্তুর নির্বাচন এমনকি উপাদানেও।

ইউরোপ থেকে প্রথম দফায় যে শিল্পীরা বাংলায় এসেছিলেন, তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন জোফানি, ডেভিস ও হিকি। বিশেষ করে জোফানি বাংলায় বড় বড় অভিজাত পুরুষদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। তার পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস ও অযোধ্যার নবাব আসফ-উদ-দৌলাও। সেন্ট জন চার্চে আঁকা ‘দ্য লাস্ট সাপার’ আর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে রক্ষিত ‘টিপু সুলতানের পুত্রকে লর্ড কর্নওয়ালিসের জামিন রূপে গ্রহণ’ চিত্রকলায় নয়াপ্রবণতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জোফানির মতো ডেভিসও ছিলেন নিজ দেশে বিখ্যাত। তার আঁকা লর্ড কর্নওয়ালিসের প্রতিকৃতি বিশেষ পরিচিত। তবে ডেভিসের প্রাসঙ্গিকতা সম্ভবত বাংলার গ্রামজীবনের বেশকিছু ছবি আঁকার কারণে, যা এখানকার সামাজিক ইতিহাসের দলিল হিসেবে টিকে আছে। অন্যান্য শিল্পী কিন্তু প্রধানত প্রতিকৃতি অঙ্কন করেই পরিচিতি লাভ করেন।

জোফানি ও ডেভিস ছাড়াও তেলরঙের প্রতিকৃতি এঁকে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন টমাস হিকি, ফ্রানচেস্কো রেনাল্ডি, রবার্ট হোম, জর্জ বিচি, মার্শাল ক্ল্যাক্সটন ও জেমস আর্চার। হিকির প্রতিকৃতির মধ্যে অন্যতম ‘জামদানি বিবি’। ইউরোপীয় চিত্রকরদের মধ্যে রবার্ট হোম সম্ভবত এ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশিদিন কাটিয়েছেন। ১৭৯১-১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় ছিলেন। প্রতিকৃতি শিল্পী হিসেবে বিখ্যাত হয়েছিলেন তার রুচি ও দক্ষতার গুণে। হোমের তুলনায় রেনাল্ডি অনেক কম সময় কাটিয়েছেন বাংলায়। কম থেকেছেন ক্ল্যাক্সটন ও আর্চারও। উল্লেখ্য, ক্ল্যাক্সটন আঁকেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ও আর্চার স্বর্ণকুমারী দেবীর প্রতিকৃতি।

আঠারো শতকে ইউরোপে হাতির দাঁতের ওপর জলরঙে আঁকা ছবির বিশেষ কদর দেখা দেয়। ভারতে সে ধারাকেই বহন করে আনেন জন স্মার্ট, ওজিয়াস হামফ্রি, স্যামুয়েল এন্ড্রুজ ও ডায়না হিল। স্মার্ট প্রধানত কাজ করেছিলেন মাদ্রাজে; অন্যদিকে হামফ্রি বাংলায়। তারা মিনিয়েচার আঁকার মধ্য দিয়ে অর্থ ও সমাদর লাভ করেন। তবে প্রতিকৃতি এঁকে সবচেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন জর্জ চিনেরি। একদিকে তিনি অনেক বেশিদিন এ দেশে থেকে কাজ করেন, অন্যদিকে তার কাজের পরিমাণ ছিল প্রচুর। কলকাতায় তিনি প্রায় ১৫ বছর ছিলেন আর সে ১৫ বছর হাতির দাঁতের ওপর মিনিয়েচার আঁকায় তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। ছোট ও বহনযোগ্য বলে এ হাতির দাঁতের ছবিগুলোর বিশেষ চাহিদা হয় কোম্পানির কর্মচারীদের মধ্যে। চিনেরি খুব বড় দরের শিল্পী ছিলেন না। তবে তেলরঙের ছবিতে তার যথেষ্ট দক্ষতা ও খ্যাতি ছিল। এ দেশে পাশ্চাত্য চিত্রকলা কদর বাড়িয়ে তোলার ব্যাপারে তার ভূমিকা ছিল বহুমুখী। তিনি পাথুরিয়াঘাটার গোপীমোহন ঠাকুরের ইউরোপীয় চিত্রকলার সংগ্রহের জন্য কাজ করেছিলেন। চার্লস ডয়েলি তার একটি কবিতায় চিনেরিকে তখনকার ভারতের শ্রেষ্ঠ চিত্রকর বলেই উল্লেখ করেছেন।

সাধারণ মানুষের জীবনধারার ছবি এঁকে প্রথম সফল শিল্পী হলেন উইলিয়াম হজেস। হজেস ভারতে এসে প্রধানত কলকাতাকেই কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন। বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে তিনি বহু স্কেচ আঁকেন। বিলেতে ফিরে তিনি ‘সিলেক্ট ভিউজ অব ইন্ডিয়া’ অ্যালবাম প্রকাশ করে ভালো টাকা আয় করেন। পরে ‘ট্রাভেলস অব ইন্ডিয়া’ বইয়ে এদেশের প্রকৃতি, জনজীবন, পেশা চিত্রিত করেন। হজেসের সাফল্যে আরো কয়েকজন পশ্চিমা শিল্পী এদেশে আসেন। তাদের মধ্যে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেন টমাস ও উইলিয়াম ড্যানিয়েল। তারা ছিলেন যথেষ্ট পরিশ্রমী। ছবি আঁকার খাতিরে সফর করেন দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত। তখনকার সরকার তাদের ছবির ওপর নির্ভর করেই রোটাস দুর্গের সংস্কার করায়। তাদের ‘টুয়েলভ ভিউজ অব ক্যালকাটা’, ‘ওরিয়েন্টাল সিনারি’ ও ‘পিকচারেস্ক ভয়েজ অব ইন্ডিয়া’ বইগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিক্রি হয় পশ্চিমা দুনিয়ায়। এর বাইরে জলরঙে ছবি এঁকে পরে এনগ্রেভিং প্রিন্ট ছেপে সাফল্য লাভ করেছিলেন শিল্পী জেমস মোফাট ও বালথাজার সোলভিন্স। ‘বাংলার চিত্রকলা’ গ্রন্থে লেখক অশোক ভট্টাচার্য তাদের প্রসঙ্গে বলেন, ‘মোফাট এঁকেছেন এ দেশের হাটবাজার আর তার কেনাবেচায় রত মানুষ; সোলভিন্সের ছবিতে ধরা আছে আঠারো শতকের বাঙালির জীবনধারা, তাদের পোশাক-আশাক, আচার-আচরণ, পালা-পার্বণ ইত্যাদির চাক্ষুষ বিবরণ।’

ঔপনিবেশিক বাংলার সমাজজীবন, ঐতিহাসিক নগরীর স্থাপত্যকর্ম ও নিসর্গের পরিচয় তুলে ধরে সমানভাবে এগিয়ে এসেছেন অপেশাদার চিত্রশিল্পীরাও। বিপুল কৌতূহল আর উদ্দীপনা নিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছবি এঁকে গেছেন। কোম্পানির কর্মকর্তা চার্লস ডয়েলির নাম এক্ষেত্রে আসে সবার আগে। ছবির বিষয় নির্বাচনে ডয়েলি সোলভিন্সের চেয়েও বৈচিত্র্যময়। তিনি তার ‘ভিউজ অব ক্যালকাটা’ ও ‘অ্যান্টিকুইটিস অব ঢাকা’ গ্রন্থে দুই শহরেব স্থাপত্যকর্মের দলিল রেখে গেছেন। এছাড়া ‘দি ইউরোপিয়ান ইন ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে এঁকে গেছেন বাংলায় কর্মরত পশ্চিমাদের বিলাসবহুল জীবনের চালচিত্র। উইলিয়াম ফ্রাঙ্কলিন ছিলেন ভারতীয় পুরাতত্ত্বে আগ্রহী ও এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য। রাজমহল থেকে গৌড় পর্যন্ত ভ্রমণ করে তিনি পাণ্ডুয়ার আদিনা ও গৌড়ের বড় সোনা মসজিদের ছবি এঁকেছিলেন। স্কটল্যান্ডের হেনরি ক্রেইটন ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় এসেছিলেন নীলকুঠিতে চাকরি করতে। গৌড় কর্মস্থান হওয়ায় তিনি সেখানকার পরিত্যক্ত স্থাপত্যের ১৫টি ছবি আঁকেন। অন্য এক শখের শিল্পী জর্জ ফ্রাঙ্কলিন অ্যাটকিন্সন ছিলেন বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার্স বাহিনীর ক্যাপ্টেন। তিনি ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘দ্য ক্যাম্পেন ইন ইন্ডিয়া’তে ২৬টি ছবির মাধ্যমে ভারতীয় ইতিহাসের প্রথম মহাবিদ্রোহের রক্তাক্ত অধ্যায় চিত্রিত করে গেছেন। তিনি ব্যঙ্গাত্মক রচনা ও চিত্রাঙ্কনেও পারদর্শী ছিলেন। ‘কারি অ্যান্ড রাইস’ নামক তার বইটির লেখায় ও ছবিতে এ দেশে বসবাসকারী কোম্পানির ইংরেজ কর্মচারীদের ত্রুটি ফুটিয়ে তুলেছেন।

যারা কলকাতায় বসে ছবি এঁকে গেছেন, তাদের তালিকায় দুজন মহিলা শিল্পীর নামও আসার দাবি রাখে। তাদের একজন শৌখিন, অন্যজন পেশাদার। প্রথমজন এমিলি ইডেন ও দ্বিতীয়জন জ্যাকুইস বেলনস। এমিলি ইডেন ছিলেন গভর্নর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ডের বোন। বছরখানেক কলকাতায় থাকার সময় তিনি শহরের জীবনযাত্রার বর্ণনা লিখে গেছেন রোজনামচায়। পাশাপাশি ছোট জলরঙে এঁকে গেছেন ছবি। সে ছবিগুলো এখন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মূল্যবান সংগ্রহ। বেলনস ছিলেন বাংলায় ভূমিষ্ঠ ফরাসিভাষী কন্যা, তার স্বামীও ছিলেন ফরাসি। নারীর দৃষ্টি নিয়ে তিনি নিখুঁতভাবে চিত্রিত করেছেন বাংলার নাগরিক জীবন, অন্তঃপুরিকাদের আচার-আচরণ-বেশভূষা, গ্রামের পাঠশালা, মজলিশ। এর বাইরেও যে চিত্রশিল্পী নেই, তা না। বাংলার স্থাপত্য ও জনজীবন বিশ্বস্ততায় অঙ্কন করেছেন জেমস মোফাট, জেমস বেইলি ফ্রেজার, উইলিয়াম টেলার, উইলিয়াম প্রিন্সেপ ও উইলিয়াম সিম্পসনের মতো শিল্পীরা।

বাংলার সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধি চিরকালই বিদেশীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে থেকেছে। ঔপনিবেশিক আমলে সে প্রবণতা যে সুতীব্র ছিল, তার প্রমাণ বাংলাকে নিয়ে পশ্চিমা শিল্পীদের চর্চা। সেসব সৃষ্টিকর্ম কেবল তাদের শিল্পীসত্তাকেই পরিচিতি দেয়নি; পরিণত হয়েছে বাংলার ইতিহাস পাঠের অনিবার্য দলিলে।

[ Disclaimer: You may visit the news source: https://bonikbarta.com/]

অনুরূপ সংবাদ
- Advertisment -

আরও খবর