প্যাডেল রিকশার নিবন্ধন থাকলেও নেই ব্যাটারিচালিতের
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত প্যাডেল রিকশা ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, সিটি করপোরেশনের নিবন্ধনের বাইরে থাকা যানটির সংখ্যা কমবেশি আরো ১০ লাখ। প্যাডেল রিকশার জন্য নিবন্ধনের সুযোগ থাকলেও দেশের প্রচলিত আইনে এর কোনো ব্যবস্থা নেই সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় থাকা ব্যাটারিচালিত তিন চাকার এ বাহনের ক্ষেত্রে। আবার ঢাকা মহানগরে ঠিক কী পরিমাণ যান্ত্রিক রিকশা চলাচল করে তার কোনো পরিসংখ্যানও সরকারের কোনো সংস্থার কাছে নেই। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে সংখ্যাটি অবশ্য কয়েক লাখ।
নিবন্ধনবিহীন ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে প্যাডেল রিকশাচালকদের রুটি-রুজি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এমন অভিযোগ এনে হাইকোর্টে রিট করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন। তাতে ঢাকা মহানগর এলাকার সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল তিনদিনের মধ্যে বন্ধ বা বিধিনিষেধ আরোপ করতে নির্দেশ দেয়া হয়। আদালতের আদেশের পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই ঢাকার বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা। কয়েক জায়গায় পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষও হয়েছে। এতে অচলাবস্থা তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের এ আদেশ স্থগিত চেয়ে সরকারপক্ষ আপিল করে। সে আদেশে এক মাসের জন্য স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে গতকাল আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক। এতে ঢাকা মহানগর এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আপাতত চলাচল করতে পারবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
এদিকে ঢাকায় আপাতত ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করতে পারলেও বাহনটিকে নিবন্ধন দেয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। ব্যাটারিচালিত রিকশার বদলে ঢাকার রাস্তায় চলাচল উপযোগী বিকল্প বাহন নামানো যায় কিনা সে চেষ্টার কথা জানিয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিকল্প হিসেবে আমরা একই ধরনের উন্নত ও নিরাপদ বাহন প্রবর্তনের চেষ্টা করছি। বুয়েটের সহযোগিতা নিয়ে কতগুলো সেফ মোটরাইজড রিকশার ডিজাইন করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে উৎপাদক পর্যায়েও যোগাযোগ করেছি। ঢাকায় হয়তো উন্নত ও নিরাপদ এসব রিকশা নিবন্ধন দেয়া হবে। অন্যদিকে ঢাকার অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোয় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলতে দেয়া যায় কিনা সে ব্যাপারে আমাদের চিন্তাভাবনা আছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’
সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা বলেন, ‘কয়েক দিন আগে ব্যাটারিচালিত রিকশার ধাক্কায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। এ ধরনের বাহন সড়ককে অনিরাপদ করে তোলে। ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন বা অনুমোদন দিয়ে আমরা তো সড়ককে অনিরাপদ হতে দিতে পারি না। ঢাকার বাইরেও বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে। সেগুলোর বিষয়েও আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
বুয়েট যে নিরাপদ মোটরাইজড ব্যাটারিচালিত রিকশার মডেল তৈরি করেছে, সেটি মূলত ‘ইজিবাইক’-কে কেন্দ্র করে। বাহনটি সম্পর্কে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার (ইজিবাইক) কিছু কাঠামোগত ও ব্রেকিং সিস্টেমের দুর্বলতা আছে। বাহনটি উন্নত করে অনেকটা ঝুঁকিমুক্ত করা সম্ভব। এজন্য হাইড্রোলিক ব্রেক, রিকশার দুই পাশে দরজা লাগানো, উইন্ডশিল্ড উন্নত করা, ইন্ডিকেটর স্থাপনসহ বেশকিছু উপকরণ সংযুক্ত করতে হবে। এসব কাজের জন্য ২০ হাজার টাকার মতো খরচ হতে পারে।’
বর্তমানে ঢাকায় যেসব ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে, সেগুলোর বেশির ভাগই সাধারণ রিকশায় মোটর বসিয়ে রূপান্তর করা হয়েছে। এ ধরনের বাহন আরো উন্নত ও নিরাপদ করার জন্য বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন বলে মনে করেন অধ্যাপক হাদিউজ্জামান।
ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের সমস্যা নিরসনে ২০২১ সালের ৭ নভেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ‘থ্রি-হুইলার ও সমজাতীয় মোটরযানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা-২০২১’-এর খসড়া প্রকাশ করে। সেটিকে চূড়ান্ত করে গেজেট আকারে প্রকাশের সুপারিশ জানিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘বুয়েট, চুয়েট, রুয়েট ও সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রতিটি ব্যাটারিচালিত রিকশার বডি মডিফাই করে ব্রেক ও গতির সমতা এনে সড়ক নিরাপত্তায় ঝুঁকিমুক্ত নিশ্চিত করে সার্টিফাইসহ নিবন্ধন নিতে হবে। সড়কের সক্ষমতা বিবেচনা করে সিলিং নির্ধারণ করে দেশের সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে এবং বিআরটিএর নিয়ন্ত্রণে তাদের আওতাধীন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন দিতে হবে। প্রতিটি ব্যাটারিচালিত রিকশার চালককে ন্যূনতম এক সপ্তাহ সড়কের আইন-কানুন, ট্রাফিক চিহ্ন, সড়কে মোটরচালিত রিকশা চলাচল পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ে দিতে হবে মৌলিক প্রশিক্ষণ। এরপর তাদের নামমাত্র ফি নিয়ে দিতে হবে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোর ড্রাইভিং লাইসেন্স। হুট করে গ্রাম থেকে এসে প্রশিক্ষণবিহীন কোনো ব্যক্তি যাতে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামতে না পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে।’
সরকার ব্যাটারিচালিত রিকশার বিকল্প হিসেবে উন্নত মানের ও নিরাপদ রিকশা নামানোর পরিকল্পনা করলেও ঢাকার বিদ্যমান বাস্তবতায় এর কোনো যৌক্তিকতা দেখেন না পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকায় যানজটের প্রধান কারণ ছোট ছোট যানবাহন। যানজট নিরসন করতে হলে ব্যক্তিগত গাড়িসহ ছোট ছোট যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং এর বিপরীতে বাসের মতো বড় যানবাহনের ব্যবস্থা করার কোনো বিকল্প নেই। ঢাকার যানজট সমস্যার সমাধান এবং টেকসই গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে আমাদের অবশ্যই ছোট ছোট যানবাহন নিরুৎসাহিত করতে হবে।’
[Disclaimer: You may visit the news source: https://www.bonikbarta.com/]

