কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে একটি বন্যহাতিকে হত্যার পর গোপনে মাটিচাপা দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। পরে হাতি হত্যার ঘটনাটি কৌশলে লুকানোর জন্য মাটিচাপা দেওয়া স্থানে একটি ঝুপড়ি স্থাপনাও তৈরি করা হয়।
তবে একমাস আগে সংগঠিত এই বন্যহাতি হত্যা এবং মাটিচাপা দেওয়ার ঘটনাটি বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে বনবিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
স্থানীয় লোকজন ও বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের আওতাধীন চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাকারা বনবিটের মুসলিমনগর এলাকার করিম্মাকাটা ঘোনা বনাঞ্চলের গভীরে প্রায় ১০ বছর বয়সী একটি বন্যহাতিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। এরপর অত্যন্ত কৌশলে ঘটনাটি গোপন করতে হাতিটির মরদেহ মাটির গভীরে পুঁতে ফেলা হয়। এমনকি সন্দেহ এড়াতে এবং দীর্ঘদিন হাতির মৃত্যুর ঘটনাটি আড়াল রাখতে মাটি চাপা দেওয়া ওই স্থানের ওপর একটি ঝুপড়ি ঘর নির্মাণ করা হয়।
ঘটনার প্রায় এক মাস পর ওই স্থান থেকে তীব্র পচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পরে তারা বিষয়টি বনবিভাগের কর্মকর্তাদের জানান। পরে নলবিলা বনবিটের টহলরত কর্মীরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করলে পুরো ঘটনাটি সামনে আসে।
খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার বিকালে ঘটনাস্থলে যান চকরিয়া উপজেলার ফাসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা সাদেকুর রহমান, চকরিয়া থানা পুলিশ ও ফাইতং পুলিশ ফাঁড়ি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মীসহ বনবিভাগের বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা। এসময় সবার উপস্থিতিতে ডুলাহাজারা সাফারিপার্কের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান মাটি চাপা দেওয়া হাতির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন এবং বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন।
জানতে চাইলে ভেটেরিনারি সার্জন মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ময়নাতদন্তে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হাতিটিকে গুলি করে অথবা জেনারেটরের বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে ইলেক্ট্রিক শক প্রয়োগের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। তবে নিশ্চিতভাবে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি। হাতির মাংস পচে যাওয়ার কারণে ল্যাব টেস্টের সহায়তা নেওয়া হবে।
বনবিভাগের চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাদেকুর রহমান বলেন, ময়নাতদন্তের পর পুনরায় হাতির গলিত মরদেহ মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ অনুযায়ী মামলা রুজুসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে ঘটনায় কারা কীভাবে জড়িত তা চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।
এদিকে হাতি হত্যার পর বনবিভাগের কার্যক্রম ও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।
তাদের অভিযোগ, বনাঞ্চলে নিয়মিত টহল ও কার্যকর পর্যবেক্ষণ থাকলে এ ধরনের ঘটনা ঘটার আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো। দীর্ঘ সময় ধরে একটি বিশাল প্রাণীর মরদেহ মাটিচাপা অবস্থায় থাকা এবং তার ওপর ঘর নির্মাণের মতো ঘটনা নজরে না আসাকে বনকর্মীদের দায়িত্ব অবহেলা বলে জানিয়েছেন অনেকে।
স্থানীয় পরিবেশ সচেতন মহল, এ ঘটনায় দোষীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বনাঞ্চলে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
চকরিয়া উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মাহমুদ বলেন, কক্সবাজার অঞ্চলের বনাঞ্চলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বন উজাড়, অবৈধ দখল, বসতি সম্প্রসারণ এবং খাদ্য সংকটের কারণে বন্যহাতির আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে হাতির পাল লোকালয়ে চলে আসছে এবং সংঘাত বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
[Disclaimer: You may visit the news source- www.ittefaq.com.bd]

