প্রকৃতির অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খ্যাত পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি নানা ঘটনা ও সংকটের মধ্য দিয়ে ২০২৫ সাল অতিবাহিত করেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে বৈষম্যের অভিযোগ, বাজার ফান্ডের জমি নিয়ে জটিলতা, পর্যটন নগরী সাজেকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনায় বছরজুড়ে জেলার নাম উঠে আসে জাতীয় আলোচনায়।গত বছরের শেষ দিকে, ২১ নভেম্বর রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত হয়নি। শিক্ষক নিয়োগে কোটা বৈষম্য, প্রশ্নপত্র জালিয়াতি, ফল প্রকাশে অনিয়ম ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে কোটা বিরোধী ঐক্যজোট, সাধারণ শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিক কমিটির উদ্যোগে হরতাল পালন করা হয়। এর আগে একই দাবিতে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিও পালন করা হয়।
আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে ছিল—জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ৯৩ শতাংশ মেধা ও ৭ শতাংশ কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা, কেন্দ্রীয়ভাবে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে খাতা মূল্যায়ন, নিয়োগ পরীক্ষার আগে উপজেলা কোটা পৃথক প্রজ্ঞাপনে প্রকাশ এবং নিয়োগ শেষে প্রার্থীদের নাম, রোল ও ঠিকানা
প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা।
এছাড়া ফলাফলে বাঙালি ও তফসিলভুক্ত উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক তালিকা প্রকাশ এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ১৯৮৯ সালের জেলা পরিষদ আইনে উপজাতীয় অগ্রাধিকার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে কি না—সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়ার দাবিও জানানো হয়। তবে এসব আন্দোলনের পরও ২০২৫ সালে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি।
বাজার ফান্ড জমি নিয়ে জটিলতা
গত বছরের নভেম্বর মাসে বাজার ফান্ডের জমি হস্তান্তর ও বন্ধকী জমি রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় রাঙ্গামাটিতে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়। ২৭ নভেম্বরের মধ্যে সমস্যা সমাধান না হলে শাটডাউন কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন স্থানীয় নাগরিকরা।
বাজার ফান্ডের জমি হস্তান্তর ও বন্ধকী জমি রেজিস্ট্রেশন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন। অনেক ব্যবসায়ী জমি বন্ধক রাখতে না পারায় ব্যাংক ঋণ থেকে বঞ্চিত হন, আবার অনেকেই জমি ক্রয়-বিক্রয় করতে পারেননি।
জানা যায়, বাজার ফান্ড আইনে সরকারি জমি বাজার ফান্ডের অন্তর্ভুক্ত করে নাগরিকদের অনুকূলে বন্দোবস্ত দেওয়া হলেও ২০১৯ সালে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসন এসব জমিকে খাসজমি হিসেবে উল্লেখ করে। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধির ১২ ধারা (২) অনুযায়ী পার্বত্য জেলাগুলোতে ব্যাংক ঋণসংক্রান্ত চুক্তিনামা রেজিস্ট্রেশনের ক্ষমতা জেলা প্রশাসকের ওপর ন্যস্ত। তবে ২০১৭ সালে রাঙ্গামাটির তৎকালীন জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নান প্রথম এই প্রক্রিয়া বন্ধ করেন। পরবর্তীতে চালু হলেও ২০১৯ সালে আবার তা বন্ধ হয়ে যায়।
সাজেকে অগ্নিকাণ্ড ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি
বছরের শুরুতে, ২৪ ফেব্রুয়ারি বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক পর্যটন কেন্দ্রে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০টি রিসোর্ট ও ১৪টি দোকান পুড়ে যায়। এতে উদ্যোক্তাদের কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এ ঘটনা সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এছাড়া পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্বশস্ত্র দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে দুইজন নিহত হন। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিরাপত্তা বাহিনী বছরের বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে। এর মধ্যে ৭ মার্চ কাউখালী উপজেলায় এবং ২৯ জুলাই বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে ইউপিডিএফের আস্তানায় অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়।
প্রাণহানি ও সামাজিক অপরাধ
২০২৫ সালে রাঙ্গামাটিতে সড়ক দুর্ঘটনা, বজ্রপাত, হাতির আক্রমণ, কাপ্তাই হ্রদে ডুবে যাওয়া, গলায় ফাঁসসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় অন্তত ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি কাউখালী উপজেলায় এক তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিকে হত্যা এবং ১৫ জুলাই একই উপজেলায় এক ব্যবসায়ীকে জবাই করে হত্যার ঘটনা ঘটে। এছাড়া বছরজুড়ে জেলায় তিনটি ধর্ষণের ঘটনাও ঘটে।
পরিবেশ ও অন্যান্য ঘটনা১১ মার্চ রাজস্থলী উপজেলায় গর্ভধারণ অবস্থায় শাবকসহ একটি মা হাতির মৃত্যু হয়। ২১ অক্টোবর বরকল উপজেলায় পাহাড়ি খাদ থেকে পড়ে কাপ্তাই হ্রদে ডুবে একটি গোলাপি রঙের হাতি শাবকের মৃত্যু হয়।
২৬ জুন রাতে রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বশস্ত্র সন্ত্রাসীরা চাঁদার দাবিতে প্রবেশ করে উন্নয়ন কাজে নিয়োজিত ১৫ জন শ্রমিকের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। পরে ঠিকাদারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা হয় বলে একাধিক সূত্রে জানা যায়। এছাড়া ১৪ আগস্ট রাঙ্গামাটি কারাগারে বীর বাহাদুর (২৯) নামে এক কয়েদির মৃত্যু হয়।
[Disclaimer: You may visit the news source-www.ittefaq.com.bd]

