কয়েক দিন ধরে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। বিষয়টি পরিবারকে বললেও তিনি থানায় কোনো জিডি বা অভিযোগ করেননি। এরই মধ্যে প্রকাশ্যে দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে নিহত হলেন মুসাব্বির। একই সময়ে গুলিবিদ্ধ হন কারওয়ান বাজার ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সুফিয়ান বেপারি মাসুদ। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে ঘটনাস্থল ও আশপাশের একাধিক ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বা এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চার-পাঁচজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে তেজগাঁও থানায় একটি মামলা করেন নিহতের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। তিনি অভিযোগ করে বলেন, হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগে থেকে মুসাব্বিরকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। কদিন ধরেই মুসাব্বির বলেছিলেন, আমার অনেক শত্রু হয়ে গেছে, যেকোনো সময় আমাকে মেরে ফেলতে পারে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, দুর্বৃত্তরা যখন মুসাব্বিরকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়, তখন তিনি প্রাণে বাঁচতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। এ সময় মুসাব্বির বলছিলেন, ‘তোরা আমার এ কী করলি..রে…।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হত্যাকারীরা আগে থেকে এলাকায় অবস্থান নিয়েছিল। পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকারীরা মুসাব্বিরের পরিচিত ছিলেন। গুলি চালানোর সময় মুসাব্বির হয়তো দুর্বৃত্তদের চিনে ফেলেছিলেন। ঘটনাস্থল এবং এর আশপাশের একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে ৭ দশমিক ৬৫ বোরের তিনটি গুলির খোশা উদ্ধারসহ অন্য আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ এবং র্যাব সমন্বিতভাবে এই ঘটনার তদন্ত করছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের মানববন্ধনে হামলার ঘটনা ঘটেছিল। ওই হামলার মামলায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। এতে এক পক্ষের আধিপত্য কিছুটা কমে যায়। এ ছাড়া ফার্মগেট এলাকায় একটি গ্যারেজ দখলকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনা চলছিল।
মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডের পেছনে এসব ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান খবরের কাগজকে বলেন, বিএনপি নেতা মুসাব্বিরের কনুইতে একটি এবং পেটে একটি গুলি লাগে। আবু সুফিয়ানের একটি গুলি লেগেছে তার পেটে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত হিসেবে ৭ দশমিক ৬৫ বোরের বুলেটের তিনটি খোসা উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে অস্ত্রধারী দুজনকে দেখা গেছে। তাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তবে কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, প্রাথমিকভাবে তা জানা যায়নি। তবে হত্যাকাণ্ডের মোটিভ খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, এলাকার আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজিসহ সব দিক মাথায় রেখে এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান ডিসি ইবনে মিজান।
এর আগে বুধবার রাত ৮টা ২০ মিনিটে তেজগাঁওয়ের স্টার কাবাবের পেছনে তেজতুরি বাজার এলাকার আহছানউল্লা টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং (এআইটিভিইটি) ইনস্টিটিউটের সামনে গুলিবিদ্ধ হন মুসাব্বির এবং আবু সুফিয়ান। পরে তাদের উদ্ধার করে পান্থপথের বিআরবি হাসপাতালে নিলে মুসাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় আবু সুফিয়ানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন আছেন।
যা দেখা গেল সিসিটিভি ফুটেজে
মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে পুলিশ জানায়, ফুটেজে দেখা গেছে স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে বস্তা নিয়ে বসে ছিল দুজন দুর্বৃত্ত। স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা মুসাব্বির ও সুফিয়ান ব্যাপারী মাসুদ একসঙ্গে হেঁটে যাচ্ছিলেন। মুসাব্বিরকে দেখামাত্র বস্তার আড়াল থেকে পিস্তল বের করে পেছন থেকে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে মুসাব্বির মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার হাতে থাকা মোবাইলফোন মাটিতে পড়ে যায়। মুসাব্বির আবার উঠে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তখনো গুলি চালানো হচ্ছিল। দুর্বৃত্তদের একজন কিছুক্ষণ থেমে মাটিতে পড়ে থাকা মুসাব্বিরের মোবাইলফোনটি তুলে নিয়ে পালিয়ে যায়।
গতকাল ঘটনাস্থলে আলাপকালে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্বৃত্তরা প্রথমে মুসাব্বিরকে লক্ষ্য করে একটি গুলি করে, সেটি লাগেনি। এ সময় তিনি পাশের একটি গলির ভেতরে ঢুকে পড়েছিলেন। ওই গলিতে বের হওয়ার পথ না থাকায় তিনি অন্য গলিতে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। এ সময় আরেক দফা গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। মুসাব্বিরের গায়ে গুলি লাগলেও তিনি দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। একটা গালি দিয়ে তিনি বলেন, ‘তোরা আমার এ কী কর..লি রে…।’ গলির মাথায় একটি দোকানের সামনে মুসাব্বির মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যান। অন্যদিকে গুলিবিদ্ধ সুফিয়ান ব্যাপারী পেটে হাত দিয়ে ক্ষত চেপে ধরে সেখানে পড়ে যান। দুর্বৃত্তরা এলাকা ছেড়ে তখন মূল সড়কে উঠে পালিয়ে যায়।
থানায় মামলা
মামলার এজাহারে মুসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম উল্লেখ করেন, বুধবার ৭ জানুয়ারি রাতে কাওরান বাজারের সুপারস্টার হোটেলের দ্বিতীয় তলায় প্রতিদিনের মতো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন মুসাব্বির। আড্ডা শেষে ৮টা ১০ মিনিটে মাসুদকে নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা দেন। ৮টা ২০ মিনিটে তেজতুরি বাজারে আহসানউল্লাহ ইনস্টিটিউটের সামনে পাকা রাস্তায় পৌঁছালে ওত পেতে থাকা অজ্ঞাতনামা চার-পাঁচজন তাদের গতিরোধ করে পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। এতে মুসাব্বিরের ডান হাতের কনুই, পেটের ডান পাশে গুলি লাগে। রক্তাক্ত জখম নিয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে বাঁচাতে সুফিয়ান ব্যাপারী মাসুদ এগিয়ে গেলে তাকেও গুলি করে হামলাকারীরা।
গতকাল তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কৈশন্যু মারমা বলেন, সব দিক বিবেচনায় রেখে তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় পুলিশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য ইউনিটও কাজ করছে।
নয়াপল্টনে মুসাব্বিরের জানাজা-আজিমপুর গোরস্তানে দাফন
গতকাল বৃহস্পতিবার বাদ জোহর রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল হক, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব রবিন, ঢাকা মহানগর উত্তরের যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম জাহাঙ্গীর, যুববিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী শফু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ইয়াসিন আলীসহ যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন। পরে মুসাব্বিরের লাশ কারওয়ান বাজারে তার বাসভবন গার্ডেন ভিউতে নেওয়া হয়। বাদ আছর কারওয়ান বাজারে দ্বিতীয় জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে মুসাব্বিরের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে যারা জড়িত তারা যারাই হোক, গ্রেপ্তার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।
এদিকে মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে শনিবার ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে স্বেচ্ছাসেবক দল।
[Disclaimer: You may visit the news source- www.khaborerkagoj.com]

