মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মধ্যপন্থাকে প্রাধান্য দিয়ে আজ ‘জনযাত্রা (পিপলস মার্চ)’ নামে আত্মপ্রকাশ করছে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। তবে শেষ মুহূর্তে এই নাম পরিবর্তনও হতে পারে। প্রাথমিকভাবে প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এটি প্রকাশ্যে আসলেও পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হবে।
তরুণ নেতৃত্বনির্ভর এই উদ্যোগের লক্ষ্য- দেশের বিদ্যমান ধর্মভিত্তিক ও ডানপন্থি রাজনৈতিক ধারার বাইরে গিয়ে ‘সামাজিক গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার লক্ষে কাজ করা।
আজ শুক্রবার বিকেল ৩টায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ হবে। সংগঠনের প্রস্তাবিত কয়েকটি নামের মধ্যে ‘জনযাত্রা’ নামটিই চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
উদ্যোক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নেতারা রাজনৈতিক দল ও প্ল্যাটফর্ম গঠন করেছেন, কিন্তু পরে তারা ‘ডানপন্থি’ হয়ে গেছেন। ফলে বাম, প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থি তরুণদের জন্য একটি স্বতন্ত্র সমাজতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন দেখা দেয়। সে লক্ষ্যেই জনযাত্রা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কট্টরপন্থি ধর্মীয় কিংবা ডানপন্থি রাজনৈতিক নেতাদের এই সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। সংগঠনটি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় কড়া নজরদারির পাশাপাশি কোনো বিতর্ক, অনিয়ম বা অসংগতি দেখা দিলে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে অগ্রসর হবে। উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দল গঠনের লক্ষ্যে সারা দেশের জেলা ও উপজেলায় তৃণমূলপর্যায়ে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন।
রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়ে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্রের মৌলিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তারা মনে করেন। একই সঙ্গে বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের ঘাটতি, সংস্কারের প্রতি অনীহা এবং অর্থ ও পেশিশক্তিনির্ভর রাজনীতিকে দেশের অগ্রগতির বড় বাধা হিসেবে দেখছেন তরুণরা।
ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি মেঘমল্লার বসু খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা সামাজিক গণতন্ত্র চাই, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব থাকবে অর্থনৈতিক খাতের, কোনো বেসরকারি কোম্পানির নয়। জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে সবকিছুকে। তাই আমরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও একাধিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে প্ল্যাটফর্ম গঠনের সিদ্ধান্তে এসেছি। তবে জামায়াত বা কোনো ইসলামী দলের সঙ্গে নয়। তারা ধর্মভিত্তিক একটি রাষ্ট্র তৈরি করতে চায়। তাদের সঙ্গে এখানে আমাদের ব্যবধান রয়েছে। আমরা ধর্মনিরপেক্ষতা, মধ্যমপন্থা, বাম ও প্রগতিশীলতাকে প্রধান্য দিচ্ছি। আমাদের এখানে যারা যুক্ত হবেন তারা মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সব যৌক্তিক সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের কথা বলবেন। জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ে কাজ করবেন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংগঠনটির নেতৃত্ববিষয়ক কাঠামো হবে ব্যতিক্রমী। এখানে কোনো সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক বা আহ্বায়ক কমিটি থাকবে না। বরং তিনজন মুখপাত্র বা ‘স্পোকসপারসন’-এর মাধ্যমে সংগঠন পরিচালিত হবে। একক নেতৃত্ব নয়, বরং সংঘবদ্ধ নেতৃত্বের ভিত্তিতেই চলবে ‘জনযাত্রা’। প্রাথমিকভাবে ১০১ সদস্যের একটি কমিটি ঘোষণা হতে পারে, যা ৬ মাসের জন্য সুপার কমিটি হতে পারে। পরে গঠনতন্ত্র ও কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে।
সংগঠন সূত্র জানায়, আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে তিন মুখপাত্রের নাম ঘোষণা করা হতে পারে, যাদের মধ্যে অন্তত একজন নারী থাকবেন। আলোচনায় থাকা নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন- জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করা সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায়, সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব মঈনুল ইসলাম তুহিন (তুহিন খান), লেখক ও গবেষক মীর হুযাইফা আল মামদূহ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক নাজিফা জান্নাত এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেঘমল্লার বসু।
এ ছাড়া সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকছেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের সাবেক যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ও আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাবেক নেতা অলিক মৃ, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি বাকী বিল্লাহ, লেখক ফেরদৌস আরা রুমী, ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদসহ বিভিন্ন তরুণ অ্যাকটিভিস্ট, ছাত্রনেতা এবং এনসিপির পদত্যাগ করা একাধিক নেতা।
সংগঠনটিকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, বাম ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
উদ্যোক্তাদের মতে, ধর্ম-বর্ণ ও মতাদর্শের বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যেই ‘জনযাত্রা’র যাত্রা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবিক মর্যাদা ও সমান অধিকারের প্রশ্নকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।
নতুন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছাত্রনেতা মাঈন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের পর সব রাজনৈতিক দলের বাইরে একটি গণতান্ত্রিক সংগঠনের প্রয়োজন। জুলাই নেতৃত্ব দেওয়া দল ও প্ল্যাটফর্মগুলো ডানপন্থি হয়ে গেছে। তাই আমরা যখন তা বুঝতে পারছি- তখন বিভিন্ন সংশ্লিষ্টস্থানে যোগাযোগ করেছি। তখনই প্ল্যাটফর্ম গঠনের কথা আসে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দল হতে পারে। সেই লক্ষ্যে আমরা সারা দেশে জেলা পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়িয়েছি। সাড়াও পাচ্ছি।’
[Disclaimer: You may visit thebnews source- www.khaborerkagoj.com]

