Beta Ver. 0.04
Wednesday, July 29, 2026
Homeখেলামুশি, এ মায়া প্রপঞ্চময়

মুশি, এ মায়া প্রপঞ্চময়

সঞ্জয় সাহা পিয়াল

অতীত বলব? খারাপ লাগে, মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। পল্টনের এনএসসি ভবনের সংবাদ সম্মেলনের কক্ষ তখন হইচইয়ে তুঙ্গে। কাঠগড়ায় প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ। খালেদ মাসুদ পাইলট তখন প্রতিষ্ঠিত তারকা। কেন পাইলটকে বাদ দিয়ে ২০০৭ বিশ্বকাপ স্কোয়াডে মুশফিকুর রহিম নামে সদ্য গোফ ওঠা কিশোরকে দলে নেওয়া হয়েছে? ব্যাখ্যা দিতে দিতে এসি রুমের মধ্যেও ঘামছিলেন ফারুক আহমেদ। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে পরিচিত সাংবাদিকদের কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, ‘ভরসা রাখুন, এই ছেলেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের লিটল মাস্টার হবে।’ তার পর তো এত বছর। ওয়ানডে থেকে তাঁরও যাত্রা ফুরাল। মুশফিকুর রহিম; নামটির সঙ্গে মিশে রয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটি প্রজন্মের ইতিহাস। যেখানে সাক্ষী হয়ে আছে সাফল্য, দ্বন্দ্ব, চিড় খেয়ে যাওয়া সম্পর্ক; আরও কত না বলা কথা। মুশি জানেন যে তাঁর বিষয়ে দু-একটি নয়, আমরা সকলেই বেশ কিছু কথা জানি। এই যেমন তিনি ভালো ক্রিকেটার, প্রচণ্ড পরিশ্রমী, প্রবল শৃঙ্খলাপরায়ন, নিষ্ঠা ও একাগ্রতায় দ্বীপের মতো এক ফালি রোদ্দুর। এর বাইরে একজন মুশফিক আছেন, যাকে আবিষ্কার করেছেন তিনি নিজেই। মানব মনের দ্বান্দ্বিক টানাপোড়েনে হিংসা, লালসা, চিন্তাকে কখনোই প্রশ্রয় দেননি। ‘সারাজীবন তো আর ক্রিকেটার থাকব না, তখন আমাকে আমার রেকর্ড নয়, ভালো ব্যবহার, ভালো আচরণের জন্যই হয়তো মনে রাখবেন।’ মিরপুরে কোনো এক ঘটনার পর বছর পাঁচেক আগে বলা মুশফিকের সেই কথাটি এখন ভীষণভাবে কানে বাজছে। আসলে মায়া আর দায়িত্ববোধ থেকে মুশফিক তাঁর ভালোবাসার ক্রিকেট জগৎকে একটা পবিত্র জায়গা হিসেবে গড়ে নিয়েছেন। যিনি কিনা ব্যবসা বোঝেন না, রাজনীতি বোঝেন না, কানকথায় সুর তুলতে জানেন না, ছলাকলার মন্ত্র জানেন না; তিনি জানেন শুধু ক্রিকেট খেলতে। এ কারণেই হয়তো পঞ্চপাণ্ডবের একজন হয়েও কোথায় গিয়ে যেন গ্ল্যামারাস ব্যাপারটি সেভাবে তাঁকে স্পর্শ করেনি। কিন্তু মায়া যে বড় প্রপঞ্চময়, সে বাঁধন যে ছিড়তেই হয়। প্রত্যেকেরই বিকল্প আছে, দ্বিতীয়টি প্রথমটিকে সরিয়ে দেয় শুধু।

যেদিন থেকে তাঁকে চিনি বলে নিজে বিশ্বাস করেছি, সেদিন থেকেই বুঝেছি ক্রিকেট তাঁর কাছে প্রার্থনার মতো। তাঁর সতীর্থদের একজনের কাছে শুনেছি, হয়তো কোনো ম্যাচে ভালো রান করতে পারেননি, কেন পারেননি? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নির্ঘুম কাটিয়েছেন। পরের দিন সবার আগে মাঠে গিয়ে একা একা অনুশীলন করেছেন। অন্য কাউকে নয়, নিজেকে নিজের কাছে কখনোই ফাঁকি দেননি। পরিশ্রম দিয়ে সৃষ্টি করা যায়– এই বিশ্বাসে নিজেকে বারবার ভেঙে গড়ার চেষ্টা করেছেন। আর সে কারণেই দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে তাঁর নাম জাতীয় দলে। নির্বাচকদের প্রভাবিত করে, বিসিবি সভাপতিকে চাপ দিয়ে জাতীয় দলে কখনও জায়গা চেয়েছেন– এমন অভিযোগ কোনো দৈনিকের সাংবাদিক কিংবা ইউটিউবারও বের করতে পারেননি। বরং পরিবারের চেয়ে এই ক্রিকেটকেই বেশি সময় দিয়েছেন। অবশ্য একটা দুর্বলতা তাঁর ছিল, এখন আছে কিনা জানি না। তিনি প্রচণ্ড অভিমানী। যাকে ভালোবাসেন, ভালো ভাবেন সে যদি কানকথা বলে, তাহলে আহত হন। ২০১৩ সালে যেমন জিম্বাবুয়ে সফরে সিরিজ হারার পর হঠাৎই অধিনায়ত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেন। এর পর ২০১৭ সালে এসে টেস্ট অধিনায়কত্বও ছেড়ে দিয়েছিলেন। তখনও অভিমান পেয়ে বসেছিল তাঁকে। তাঁর মনে হয়েছিল প্রাপ্য সম্মান তিনি পাচ্ছেন না। ইংল্যান্ডের মতো দলকে হারানোর পরও সংবাদ মাধ্যমে অধিনায়কত্বের প্রশংসা করা হয়নি। বরং সাবেক এক অধিনায়কের পরামর্শে টেস্ট জিতেছে এমন একটা ন্যারেটিভ প্রচারিত হয়। বিসিবির অন্দরমহল থেকেও তাঁর অধিনায়কত্ব নিয়ে কানকথা শুরু হয়। অথচ অধিনায়কের দায়িত্ব নিয়ে ড্রেসিংরুমে সবার সঙ্গে মিশে যাওয়ার জন্য নিজের অভ্যাসের বাইরেও অনেক কিছু করেছেন! এমনকি ড্রেসিংরুমের যে গ্রুপিংয়ের কথা এতদিনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানেও মুশফিক গা বাঁচাতে পেরেছিলেন। শুধু কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের প্রথম দফায় প্রতিবাদী মুখ ছিলেন। ক্রিকেটের বাইরে অনেকেই যেখানে বিজ্ঞাপনের বাজারের জন্য নিজেদের তৈরি করেছিলেন, সেখানেও বেশি সময় দিতে দেখা যায়নি তাঁকে। আত্মাভিমান তাঁর এতটাই প্রবল যে, একসময় সিদ্ধান্ত নেন আর কখনোই আইপিএলে নাম পাঠাবেন না। আর কখনোই জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব করবেন না। জানি না, কী কারণে বুধবার রাতে ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি অবসরের ঘোষণা দিলেন। তবে আন্দাজ করতে পারি, হয়তো কারও কথা বা ফোনে তাঁর সেই আত্মাভিমানে আঘাত লেগেছিল। তবে বিশ্বাস করতে চাই, আবেগ নয়, বাস্তবতা স্বীকার করেই তিনি সরে গিয়েছেন। কারণ তিনি কখনোই নিজেকে ফাঁকি দিতে পারবেন না। তাই হয়তো ওয়ানডেতে আর তাঁকে দেখা যাবে না জাতীয় দলের জার্সিতে। অপেক্ষায় থাকব, আরও কয়েকটি বছর তাঁর সেই রংচটা টেস্ট ক্যাপ পরে মাঠে নামবেন। তিনি যেমন বাংলাদেশ ক্রিকেটের পথিকৃত, তেমনি পথিকও তো বটে। ধন্যবাদ মুশি।

অনুরূপ সংবাদ
- Advertisment -

আরও খবর