সহায়ক ব্যবসা পরিবেশের সূচকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে বিগত সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সম্প্রতি জাপান সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা জাইকার এক জরিপ প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ নিয়ে দেশটির ৪৫ শতাংশ উদ্যোক্তা অসন্তুষ্ট। এদেশে বিনিয়োগে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে চিহ্নিত করেছেন তারা। প্রায় একই রকম উপাত্ত গবেষণা সংস্থা সিপিডি এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) যৌথ জরিপ বলছে, ব্যবসা পরিচালনায় ঘুষ এবং দুর্নীতি প্রধান দুই বাধা।
এমন বাস্তবতায় ব্যবসা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। শিল্পকারখানা এবং উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের লাইসেন্স এবং সনদ প্রতিবছর নবায়নের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। নিবন্ধন সনদ একবার নেওয়ার পর নবায়নের প্রয়োজন হবে না। লাইসেন্সসহ বাকি সনদের মেয়াদ ৫ বছর করা হচ্ছে। অন্তত ২০টি কর্তৃপক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্স, অনুমতিপত্র, অনাপত্তিপত্র, ছাড়পত্র ও বিভিন্ন অনুমোদন নিতে হয়।এসব সেবার মেয়াদ এখন এক বছর। সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ-সংক্রান্ত সেবা পেতে ঘুষ, দুর্নীতি, হয়রানি, কালক্ষেপণের অভিযোগ রয়েছে ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদের।
গত মাসে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সংস্কারমূলক কিছু পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনা পেয়ে শ্রম আইন সংশোধনের খসড়ায় লাইসেন্স নবায়নের মেয়াদ ৫ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব সংযুক্ত করা হয় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। আগামী মার্চের মধ্যে শ্রম আইন সংশোধনে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার।
খসড়ায় বলা হয়, বর্তমান শ্রম বিধিমালায় নিবন্ধিত কারখানা, দোকান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারি সংস্থা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের মেয়াদ যে তারিখে মঞ্জুর করা হবে, সেই তারিখ থেকে এক বছর বলবৎ থাকে। দেশে নিবন্ধিত তৈরি পোশাক কারখানা আছে ৩ হাজার ৯৩৪টি। পোশাকবহির্ভূত কারখানা আছে ৩৯ হাজার ৬৪৩টি। বিভিন্ন স্থাপনা আছে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৩৪টি। দোকানের সংখ্যা ২৬ হাজার ১৩৮টি। এ ছাড়া অনিবন্ধিত পোশাক এবং পোশাকবহির্ভূত ৫ হাজার ৬১০টি। অনিবন্ধিত স্থাপনা আছে ৯ হাজার ৭০০ এবং দোকানের সংখ্যা ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৬০টি। এ নিয়ে মোট কারখানা, স্থাপনা ও দোকানপাটের সংখ্যা জানা মতে, ২ লাখ ৩৪ হাজার ৪১৯টি।
প্রতিবছর এ বিশালসংখ্যক কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের নবায়ন ও নতুন লাইসেন্স প্রক্রিয়ার কাজ শেষ করতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রায় পুরোটা সময় ব্যয় করতে হয়। লাইসেন্সের মেয়াদ ১ বছরের পরিবর্তে ৫ বছর করা হলে এসব প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং মান উন্নয়নের মতো প্রধান উদ্দেশ্যের দিকে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সমকালকে বলেন, ২০ থেকে ২২টি বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্স এবং সনদ প্রতিবছর নবায়ন করতে হয়। এতে বস্তা বস্তা কাগজপত্রের সঙ্গে মোটা টাকার ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ না দিলে হয়রানি করা হয়। কোনো কাজ হয় না। নবায়নের এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়া হলে তা ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে। বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং টেড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশিকুর রহমান তুহিন বলেন, নানা রকম লাইসেন্স নিবন্ধন ও সনদ এবং প্রতিবছর এগুলো নবায়নের পেছনেই তাদের একটা বড় সময় ব্যয় হয়। বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে হয়রানি এবং ঘুষ বাণিজ্য অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। সেবাপ্রাপ্তিতে সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোক্তাদের আস্থা বাড়বে।
আইন সংশোধনের বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রম সচিব সফিকুজ্জামান সমকালকে বলেন, সংশোধনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের শ্রম আইন করতে চায় সরকার। ব্যবসা-বিনিয়োগ এবং মালিক-শ্রমিক সব পক্ষের সহায়ক আইন প্রণয়নে এ-সংক্রান্ত একটি টেকনিক্যাল কমিটি কাজ করছে। এতে আইএলওর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ রয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের জন্য আগামী ফেব্রুয়ারিতেই উত্থাপন করা হবে। এর পর অধ্যাদেশ জারি করা হবে।
[Disclaimer: You may visit the news source-samakal.com]

