চিরসবুজ কণ্ঠের অধিকারী রফিকুল আলম প্রায় ৬ দশক ধরে বাংলাগানের ঝুলিকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। সংগীত এবং চলচ্চিত্রশিল্পে কাজ করার সুবাদে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। প্রখ্যাত এই কণ্ঠশিল্পীর দীর্ঘ সংগীতজীবনের স্মৃতি, প্রাপ্তি এবং বর্তমান সময়ের ব্যস্ততা নিয়ে তার সাথে কথা বলেছেন শিশির রোয়েদাদ।
সংগীতজীবনের শুরুটা সম্পর্কে জানতে চাই।
পারিবারিকভাবেই শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশে বড় হয়েছি। বড় ভাই গল্প করতেন। রাজশাহীতে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা তখনও খুব ভালো ছিল। ১৯৬৪ সালে রেডিওতে রবীন্দ্রনাথের গানের মাধ্যমে সংগীতের ক্যারিয়ার শুরু করি
আপনার ক্যারিয়ারের স্বর্ণালী সময়ের কথা শুনতে চাই।
স্বাধীনতার পরের দুই দশক আমার জন্য খুব ভালো সময় ছিল। ওই সময়ে য় বড় বড় শিল্পী ও সংগীত পরিচালকদের সাথে ভালো কিছু গানে কাজ করেছি। গান নিয়ে বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়িয়েছি।
ষাটের দশকের শিল্পচর্চা সম্পর্কে কী বলবেন?
ব্যান্ডের জন্য বাংলাদেশ এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান পাইওনিয়ার। ১৯৬৫-৬৬ সালে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ আবার আমাদের এখানে ছয় দফা আন্দোলন তখন রাজশাহীতে ‘হ্যারিকেন’ নামের একটি ব্যান্ড ছিল এবং ঢাকা চট্টগ্রাম মিলিয়ে আরো কিছু। জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ছিল ব্যান্ডের পনের প্রভাব যেমন ছিল আধুনিক ও ফোক গানের চর্চাও হতো। ঘাটের দশক গানের জন্য স্বর্ণালী সময় ছিল। শুধু গান নয়, এ সময়টা শিল্পের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল।
গানের সাথে প্রযুক্তির সম্পর্ক কী?
শাস্ত্রীয় সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ওস্তাদ আমির খাঁ সাহেব বলেছিলেন, ‘যখন মাইক্রোফোন আবিষ্কার হয়েছে তখন মাইক্রোফোনকে মাথায় রেখে আমাকে গাইতে হয়। অর্থাৎ প্রযুক্তি দ্বারা আমি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি। প্রযুক্তি যেভাবে চাইবে, সেভাবে আমাকে আউটপুট দিতে হবে।’ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলেজেকি গানের ক্ষতি করতে পারে বলে ধারণা করছি।এটা মননশীলতাকে সীমাবদ্ধ করে দিতে পারে। গানের বিষয়ে ইনফরমেশন ইনপুট দিলে সেই অনুযায়ী ৫ মিনিটে পান তৈরি করে দেয় এআই। ভয় হচ্ছে এটা না আবার ভালোমন্দের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়।
আপনার ‘এক হৃদয়হীনার কাছে’ গানটির সাথে মান্না দে’র একটি গানের মিল প্রসঙ্গে জানতে চাই।
‘এক হৃদয়হীনার কাছে’ গানটি রেকর্ড হয়েছে ১৯৭৭ সালে। গানটির এই লাইন নিয়ে কাছাকাছি সুরে ৫ বছর পর মান্না দে আরেকটি গান করেছেন। মল্লা দে-কে আমি বলেছিলাম, দাদা ‘এক হৃদয়হীনার লছে’ গানটি আমি কিন্তু আপনার আগেই করেছি। সুরটাও কাছাকাছি। গেয়েও শোনালাম দুই লাইন।তিনি বললেন, তাইতো, আমার কাছে এলো কীভাবে? আমি বললাম, সত্যজিৎ রায়ের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন শ্যামল দত্ত রায়, তিনি আমাদের গানের বেশ ভক্ত ছিলেন। আমাদের ওখানে গান সংগ্রহের জন্য যেতেন। তখনকার সমসাময়িক সব শিল্পীদের ভালো ভালো গান তিনি সংগ্রহ করতেন। তার কাছ থেকেই হয়তো আপনার গীতিকারের কাছে গানটি গিয়েছে। মান্না দে বললেন, এমন তো হতেই পারে।
‘আশা ছিলো মনে মনে’ গানটির পেছনের গল্প শুনতে চাই।
সংগীত পরিচালক শাহনেওয়াজ আমাকে বললেন, ফোক ধাঁচের একটি গান গাইতে হবে। আমি বললাম, ফোক আর নজরুলে ভীতি আছে আমার। তিনি বললেন, তুমি তোমার মতো করেই গাইবে, শুধু সুরটা ফোক ঘরানার। জছির রায়হান তার ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের প্রয়োজনে চার লাইন লিখেছিলেন। ‘আশা ছিলো মনে মনে প্রেম করিব তোমার সনে, তোমায় নিয়ে ঘর বাঁধিবো গহীন বালুচরে’। আরো কিছু লাইন যোগ করে একটি পূর্ণাঙ্গ গান বানালো গীতিকার নুরুজ্জামান শেখ।
‘তুমি আমার মনের মানুষ’ গানটি সম্পর্কে জানতে চাই।
গানটি মূলত সাবিনা ইয়াসমিনের। শেষের দিকে সালমানের লিপসিংয়ে আমার কয়েকটি লাইন আছে। সালমানের ইচ্ছেতেই গানটি করছিলাম। ও খুব চেয়েছিল যাতে ওর লিপসিংয়ে আমার কন্ঠ থাকে। আমার গান সালমান শাহ ভীষণ পছন্দ করত। সালমানের জন্যে পরবর্তী সময়ে এটা আমার গান হিসেবে বেশি পরিচিতি পায়।
সালমান শাহ এবং জাফর ইকবাল-এর সাথে আপনার স্মৃতি নিয়ে যদি বলেন…
সালমান শাহ ছিল আমার ছোট ভাইয়ের মতো, জাফর ইকবাল ছিলেন বন্ধু। সালমানের সঙ্গে মাঝে মাঝেই দেখা হতো। ও আমাকে খুব রেসপেক্ট করত, মানে সিনিয়রিটি দিত আরকি। খুব চঞ্চল এবং ভদ্র ছিল ছেলেটি। আর জাফনা ইকবালের সাথে সম্পর্কটা আড্ডাবাজির। ও নিজেও খুব ভালো গান করত, ওর একটা ব্যান্ড ছিল, ওর সাথে অনেক মজার ঘটনা আছে। একদিন আমাকে ফোন দিয়ে বলছেন, স্টুডিও শিফট ভাড়া নিয়ে ২ ঘণ্টা ধরে আপনার ‘এক হৃদয়হীনার কাছে’ গানটি শুনছি। এই গানটি আমি গাইতে চাই।আমি মজা করে বললাম, তুমি জনপ্রিয় নায়ক, যদি আমার গান গাও তাহলে তো গানটি তোমার হয়ে যাবে। কিন্তু নাছোড়বান্দা বলে, ভাই পনটি আমি লিপসিং করব। তয়েস আপনারই থাকবে নামও আপনার থাকবে। বললাম, ঠিক আছে করো। পরবর্তী সময়ে সত্যি সত্যি গনটি তার
হয়ে গিয়েছিল। বেশ কিছু পত্র-পত্রিকায় জফর ইকবালের গান হিসেবে প্রচার হয়েছিল।
বর্তমান সময়ে কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন?
স্টেজ শো নিয়মিত করছি। কিছু আধুনিক গান, কবিতার গান, এ প্রজন্মের মিউজিক ডিরেক্টরদের সাথে কাজ করছি। সম্প্রতি দুটি গানের রেকর্ডিং শেষ করেছি।
সংগীতজীবনে আপনার প্রাপ্তি সম্পর্কে জানতে চাই।
যে ভালোবাস পেয়েছি এবং পেয়ে যাচ্ছি এটাই বড় স্বীকৃতি। কয়েক প্রজন্ম আমার গান শোনে। কবি শামসুর রাহমানের কবিতা থেকে আমার একটি গান আছে ‘কথনো আমার মাকে কোনো গান গাইতে শুনিনি’ গানটি অনেক বিখ্যাত না, কিন্তু সুধীমহলে খুব সমাদৃত। এটাও আমার কাছে একটা বড় স্বীকৃতি।
[Disclaimer: You may visit the news source-www.ittefaq.com.bd]

