শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট দলের কোনো জায়গা দেশে নেই
ফ্যাসিবাদের সব বৈশিষ্ট্য আওয়ামী লীগ প্রকাশ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, ‘অন্তত এ মুহূর্তে এ দেশে শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামী লীগের কোনো জায়গা নেই।’
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন অধ্যাপক ইউনূস। তার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গতকাল নিজেদের অনলাইন সংস্করণে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমটি।
আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে সাক্ষাৎকারে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নিজেদের স্বার্থে তারা দেশের জনগণ, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কব্জা করে রেখেছিল।’ অধ্যাপক ইউনূস মনে করেন, একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কোনো ফ্যাসিস্ট দলের অস্তিত্ব থাকা উচিত নয়।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস বলেছে, এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো ও বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের পক্ষে ড. ইউনূস নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন।
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীসহ অনেক মানবাধিকার সংগঠনের অভিযোগ, গত কয়েকটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কারচুপি করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কুক্ষিগত করা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালানোর অভিযোগও আছে দলটির বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম সাময়িক নাকি স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখা হবে, নাকি দলটির সংস্কার প্রয়োজন, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে।
ড. ইউনূসের ধারণা, আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন একটি দলে পরিণত হতে পারে। তবে দলটির পরিণতি কী হবে, সে সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকার নেবে না বলে জানান প্রধান উপদেষ্টা। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘বর্তমান ক্ষমতায় যারা আছে, তারা কোনো রাজনৈতিক সরকার নয়। আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে কিনা, সেই সিদ্ধান্ত হবে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে।’
সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, তাদের দল যেকোনো সময় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে প্রস্তুত রয়েছে।
‘দরিদ্রদের ব্যাংকার’ হিসেবে পরিচিত ড. ইউনূস ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে খ্যাতিমান এ অর্থনীতিবিদকে লক্ষ্যবস্তু বানান শেখ হাসিনা। অনেক সমালোচক তার এ ভূমিকাকে প্রতিহিংসা হিসেবে মূল্যায়ন করে থাকেন।
ড. ইউনূস জানান, রাজনীতিতে যোগ দেয়া কিংবা কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করার ইচ্ছা তার নেই। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ হলো বিভিন্ন বিষয় নিষ্পত্তি এবং নতুন সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা। যখন নির্বাচনের প্রস্তুতি শেষ হবে, তখন আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসব।’
শেখ হাসিনা সরকারের সবচেয়ে বড় সমর্থক ধরা হয় ভারতকে। শেখ হাসিনার পতনের পর দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সংকুচিত হয়ে পড়ে।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘বর্তমান সরকার শেখ হাসিনাকে ভারতের কাছে ফেরত চাইবে। তবে তা চাওয়া হবে দেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর।’ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা ও অন্য ৪৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
ড. ইউনূস বলেন, ‘তার (শেখ হাসিনা) বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। রায় হওয়ার পর ভারতের সঙ্গে করা প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাকে আমরা দেশে ফেরত আনার চেষ্টা করব। রায় পাওয়ার আগে আমাদের এ চেষ্টা করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে হয় না।’
গত আগস্টে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ‘বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা চালানোর যে অভিযোগ তার মায়ের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, তা মিথ্যা। শেখ হাসিনা কোনো বেআইনি কাজ করেননি, তাই যেকোনো অভিযোগ মোকাবেলা করতে তিনি প্রস্তুত রয়েছেন।’
ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্বে আসার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ করেন নয়াদিল্লির অনেকে। তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশে সরকারের পরিবর্তন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে।
শেখ হাসিনা উৎখাত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী দেশের বাইরে পালিয়েছেন, অনেকেই আত্মগোপন করে আছেন।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, ‘হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কিছু সহিংসতার ঘটনা এবং তাতে খুব অল্প প্রাণহানি ঘটেছে। মূলত আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকায় এসব সহিংসতা ঘটেছে; ধর্মীয় পরিচিতির কারণে ঘটেনি।’
সরকারপ্রধান বলেন, ‘হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ (আগস্টে হামলার প্রসঙ্গ) আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু সমালোচকরা ওই বয়ানকে ভিন্নদিকে প্রবাহিত করেন।’
নয়াদিল্লির সমর্থনের ঘাটতি অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘আহত’ করেছে বলে মন্তব্য করেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, ‘দেশে এলে মোদিকে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানানো হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করেছি যে আমরা প্রতিবেশী, আমাদের একে অপরের প্রয়োজন, আমাদের মধ্যে অবশ্যই সবচেয়ে ভালো বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকতে হবে, যা যেকোনো দুই প্রতিবেশীর মধ্যে থাকে।
[ Disclaimer: You may visit the news source:- https://bonikbarta.com/]

