ইরানে যুদ্ধ ‘খুব শিগগির’ শেষ হবে– মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পর গতকাল মঙ্গলবার তেলের দাম ব্যাপকভাবে কমেছে। গত সোমবার অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছেছিল। গতকাল তা প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলারে নেমে আসে।
গতকাল মঙ্গলবার বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাহত হবে– এমন আশঙ্কা থেকে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বাড়তে থাকে। যুদ্ধের আগের তুলনায় তেলের দাম এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হলেও নতুন এ ইতিবাচক পরিবর্তনে ইউরোপের শেয়ারবাজারগুলো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। গ্যাসের দামও কমেছে।
ট্রাম্প বলেছেন, তিনি মনে করেন, ‘যুদ্ধটি সম্পূর্ণ, প্রায় সম্পূর্ণ।’ পরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা নিয়ে ইরানকে সতর্ক করেন। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘যদি ইরান এমন কিছু করে, হরমুজ
প্রণালিতে তেলের প্রবাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের এখন পর্যন্ত যতটা আঘাত পেয়েছে, তার চেয়ে ২০ গুণ বেশি আঘাত পাবে।’ ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি ‘ট্রাম্পের বাজে কথার জবাবে’ বলেছে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ‘এ অঞ্চল থেকে এক লিটারও তেল রপ্তানি করতে দেবে না।’
ইরান যুদ্ধ শুরুকে ভ্রমণের সঙ্গে তুলনা করেন ট্রাম্প। ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা একটু ভ্রমণ করেছি। কারণ আমরা মনে করেছি, কিছু মন্দ কাজ থেকে মুক্তি পেতে আমাদের এটি করতে হবে। তার পর আমি মনে করি, আপনি দেখতে পাবেন এটি একটি স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণ হতে চলেছে।’
তাঁর বক্তব্যের দ্রুত প্রভাব পড়ে তেলের বাজারে। অপরিশোধিত তেল গতকাল ৯০ দশমিক ২১ ডলারে পৌঁছায়। দাম কমেছে গ্যাসেরও। যুক্তরাজ্যে মাসিক সরবরাহের দাম ১০ শতাংশের বেশি কমে ১২৩ পয়সা প্রতি থার্মে দাঁড়িয়েছে, যা গত সোমবার ছিল সর্বোচ্চ ১৭১ পয়সা।
তেল ও গ্যাস বিনিয়োগ সংস্থা ইন্টারক্যাপিটাল এনার্জির প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলবার্তো বেলোরিন বলেন, তেলের দামের পতন ব্যবসায়ীদের ‘নিঃশ্বাস ফেলার’ মুহূর্ত দিয়েছে। কিন্তু জ্বালানি বাজার এখনও ‘সম্পূর্ণ টানাপোড়েনের’ মধ্যে আছে। তিনি বলেন, তেলের লেনদেন ‘অবিশ্বাস্য রকম অস্থির থাকবে’। সংঘাত আরও বাড়লে দাম বেড়ে যাওয়ার এবং কমলে দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এ সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যায়। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর যুদ্ধ শুরু হলে এ পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
‘বিপর্যয়কর পরিণতি’ নিয়ে সতর্ক করলেন আরামকোর প্রধান
বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের আরামকোর প্রধান আমিন নাসের রুটটি অবরুদ্ধ থাকলে বাজারের জন্য ‘বিপর্যয়কর পরিণতি’র বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী তেলের মজুত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার অর্থ হলো, এগুলো দ্রুত ব্যবহার করা হবে। তিনি বলেন, এ বাধা যত দীর্ঘ হবে, বিশ্ব অর্থনীতির জন্য পরিণতি তত বেশি ভয়াবহ হবে।
কিছু দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হতে পারে– বলছেন ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, বাড়তে থাকা জ্বালানি তেলের দাম মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র কিছু তেল-সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা বিবেচনা করছে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘কিছু দেশের ওপর আমাদের নিষেধাজ্ঞা আছে। পরিস্থিতি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত আমরা ওই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেব।’
একই সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প জানান, তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ‘খুব ভালো’ একটি ফোনালাপ করেছেন। ট্রাম্প বিস্তারিত বলেননি– কোন দেশের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ভারতের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে, যাতে তারা সমুদ্রপথে আটকে থাকা রুশ তেল কিনতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা ভয়াবহ সংকট তৈরি করতে পারে
গতকাল মঙ্গলবার এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেলের চাহিদা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে এর প্রভাব কতটা ভয়াবহ হবে, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে রীতিমতো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য বলছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়াম পরিবহন করা হয়। এটি বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের এক-চতুর্থাংশের বেশি। এসব জ্বালানি তেলের সিংহ ভাগেরই গন্তব্য এশিয়া। পরিসংখ্যান বলছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়া অপরিশোধিত তেলের অর্ধেকের বেশি যায় চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়।
স্বাভাবিকভাবেই এই নৌপথে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা তৈরি হলে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোই সবার আগে এবং সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে। সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এই অঞ্চলের দেশগুলোর শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়– সবই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ট্রাম্পের আশ্বাস সত্ত্বেও তেলের দাম ১৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান আমেনা বকর সিএনএনকে বলেন, যদি হরমুজ প্রণালি এভাবে বন্ধ থাকে, তাহলে মার্চের শেষ নাগাদ তেলের দাম সহজেই ১৫০ ডলার স্পর্শ করতে পারে।
[Disclaimer: You may visit the news source-samakal.com]

