Beta Ver. 0.04
Monday, September 14, 2026
Homeজাতীয়বিপন্ন নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা: গতি পাচ্ছে থমকে থাকা সমীক্ষা

বিপন্ন নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা: গতি পাচ্ছে থমকে থাকা সমীক্ষা

বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় রক্ত দেওয়া দেশের মাটিতেই ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা চর্চা। সরকার স্বীকৃত ৫০ নৃগোষ্ঠীর ৪১ ভাষার মধ্যে অর্ধেকের বেশি ভাষার নেই লিখিত রূপ। আর নৃভাষা-বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা শেষ হওয়ার এক দশক পরও তার অধিকাংশ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নথিবদ্ধকরণের ধীরগতি ও নতুন প্রজন্মের আঞ্চলিক ভাষামুখী প্রবণতায় বহু ভাষা এখন নিষ্প্রাণ হওয়ার পথে। কথ্যভিত্তিক ভাষাগুলো প্রজন্মান্তরে টিকে থাকার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ছে। সরকার ২০১০ সালে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতের অঙ্গীকার করে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট নৃভাষা-বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা হাতে নেয় এবং ২০১৪ সালে ৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজ শুরু করে। পরিকল্পনা ছিল ১০ খণ্ড বাংলা ও ১০ খণ্ড ইংরেজি প্রতিবেদন প্রকাশের। কিন্তু ২০১৮ সালে মাত্র একটি খণ্ড প্রকাশের পর সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়। 

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী (ভাষা, গবেষণা ও পরিকল্পনা) খবরের কাগজকে জানান, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই থমকে থাকা কাজগুলো এগিয়ে নিতে বাজেট প্রস্তাবনা তৈরি করেছেন তারা। সেই প্রস্তাবনা কিছুদিনের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেবেন। অর্থ মন্ত্রণালয় হয়ে সেই প্রস্তাবনা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় অনুমোদন করলে এই অর্থ বছরেই নৃতাত্ত্বিক ভাষা সমীক্ষার কাজ পুনরায় শুরু করবে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। 

নূরে আলম সিদ্দিকী খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা বেশ কিছু পরিকল্পনা করছি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বেশ কয়েকটি ভাষা নিয়ে নতুন সমীক্ষার কাজ শুরু করব। পাশাপাশি যে কাজগুলো অনেক দিন ধরে থমকে আছে সেগুলো শেষ করা হবে।’ ‘প্রাতিষ্ঠানিক বিধিনিষেধের’ কারণে সমীক্ষার সব তথ্য এই প্রতিবেদককে জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। পরে বলেন, এ বছর দেশের বিলুপ্তপ্রায় কয়েকটি মাতৃভাষা নিয়ে কীভাবে সমীক্ষার কাজ শুরু করা যায় এই পরিকল্পনা করবেন তারা। 

ভাষা সমীক্ষায় দক্ষ জনবল ও ধাপভিত্তিক পরিকল্পনার তাগিদ
নৃতাত্ত্বিক ভাষা সমীক্ষা দলের প্রধান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সৌরভ সিকদার। মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ভাষা সমীক্ষা প্রকল্প পুনরায় শুরু করতে হলে আগে অসমাপ্ত কাজগুলোর প্রকাশ, দক্ষ গবেষক তৈরি এবং ধাপভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করেন এই ভাষাবিজ্ঞানী। 
অধ্যাপক সিকদারের ভাষ্য, নতুন করে সমীক্ষা শুরুর আগে পুরোনো কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তার দাবি, অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের সফট কপি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে সংরক্ষিত নেই বলে জানানো হয়েছে, যা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, রেংমিটচা, সৌরাসহ বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলো নিয়ে কাজ করতে হলে হুট করে প্রকল্পের ঘোষণা না দিয়ে আগে গবেষক তৈরি করতে হবে।

সৌরভ শিকদারের ভাষ্যে, ‘শুধু অর্থ বরাদ্দ দিয়ে মাঠে নামলেই হবে না। ফিল্ডে নামার আগে গবেষকদের ট্রেনিং দিতে হবে, পরিকল্পনা করতে হবে, তারপর কাজ শুরু করতে হবে। কারণ দেশে ভাষাবিজ্ঞানে দক্ষ জনবল খুবই সীমিত।’

অধ্যাপক সিকদার বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় বই তৈরি হলেও অনেক জায়গায় শিক্ষক না থাকায় সেগুলো কার্যকর হচ্ছে না। তিনি মনে করেন, সংশ্লিষ্ট ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী থেকে শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নিয়োগনীতিতে ভাষাভিত্তিক অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাবও দেন তিনি।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনেক পরিবার এখনো মনে করে মাতৃভাষায় পড়লে চাকরির সুযোগ কমে যায়। এই ধারণা ভাঙতে কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি। অধ্যাপক সিকদার বলেন, ‘কমিউনিটিকে বোঝাতে হবে যে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা শিশুদের শেখার ভিত্তি শক্ত করে।’

নৃতাত্ত্বিক ভাষা সমীক্ষায় জাতীয়, কারিগরি ও বাস্তবায়ন–এমন একাধিক কমিটি ছিল। এগুলোর কার্যক্রম সক্রিয় করা, বহুভাষিক শিক্ষা সেল চালু রাখা এবং প্রতিবছর নতুন ভাষা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিলে পাঁচ বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কাঠামো তৈরি সম্ভব।

পাহাড়ি জনপদে আগ্রহ, তবে আর্থিক সংকট প্রকট
পাহাড়ি জনপদে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর শিশুরা নিজেদের মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক স্তরে পাঠ নিতে আগ্রহী বলে জানান ম্রো ভাষার লেখক-গবেষক ইয়াং ঙান ম্রো। তিনি বলেন, ‘তিন-চার বছর ধরে নৃগোষ্ঠীর ভাষায় পাঠ্যপুস্তক ছাপাতে পারছি না। শিশুরা নতুন পাঠ্যপুস্তক না পেয়ে খুবই বিরক্ত। আর একই ধরনের বইও তারা পড়তে চাইছে না। তারা চায় নতুন কিছু থাকুক তাদের পাঠ্যপুস্তকে। পুরো বিষয়টা নির্ভর করছে অর্থের ওপর। আমরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে আর কতটা করতে পারি?’

পাহাড়ি জনপদে শুধু রেংমিটচা না; খুমি, খিয়াংসহ নানা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। ইয়াং ঙান ম্রো বলেন, ‘পাহাড়ের দুর্গম জনপদে কিছু জনগোষ্ঠী আছে যাদের সংখ্যা হয়তো হাজার দেড়েক হবে। অথচ তাদের মাতৃভাষা ঠিকঠাক বলতে পারা লোকের সংখ্যা ৬-৭ জনের বেশি না।’

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাজঘাট চা-বাগানের সৌরা জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করছেন এক দল তরুণ। তাদের একজন সৌরভ প্রসাদ সোম জানান, এই জনগোষ্ঠীর মানুষ এমনিতেই লাজুক প্রকৃতির। সৌরা বস্তিতে পরিবারের সংখ্যা ১০। অথচ এখন মাত্র একজন মানুষ এই ভাষাটা সঠিকভাবে বলতে পারেন। তাদের বর্ণমালায় কিছু লিখতে পারেন। তিনি চলে গেলে সৌরা ভাষাটাই শ্রীমঙ্গল থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

[Disclaimer: You may visit the news source- www.khaborerkagoj.com]

অনুরূপ সংবাদ
- Advertisment -

আরও খবর