Beta Ver. 0.04
Wednesday, June 17, 2026
Homeবাণিজ্য-অর্থনীতিসুদের হার কমানোসহ ব্যবসায়ীদের একগুচ্ছ দাবি

সুদের হার কমানোসহ ব্যবসায়ীদের একগুচ্ছ দাবি

বিনিময় হার না বাড়ানো, সুদের হার কমানো, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার বাড়িয়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করাসহ একগুচ্ছ দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। 

সোমবার (৬ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের নেতারা এসব দাবি জানান। বৈঠকে সংগঠনটির প্রশাসক আব্দুর রহিম খানের নেতৃত্বে এফবিসিসিআইয়ের নেতাদের প্রতিনিধিদল এটিসহ ১২ দফার লিখিত প্রস্তাব দেয়। এ সময় গভর্নর অনেক দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান ব্যবসায়ী নেতারা।

সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) প্রতিনিধিদলের সঙ্গেও তার কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।  

এ সময়ে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বর্তমানে নীতিগত সুদের হার ১০ শতাংশ রয়েছে। এর ফলে ঋণের ওপর সুদহার প্রায় ১৬-১৭ শতাংশে পৌঁছেছে।

তাসকীন আহমেদ আরও বলেন, বর্তমান অবস্থা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্যসংকটের প্রতিফলন। এর কারণে ব্যাংক থেকে অর্থায়ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ক্রমেই ব্যয়বহুল ও অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং স্বল্প মুনাফাভিত্তিক উৎপাদনশীল শিল্পের জন্য মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। 

এফবিসিসিআইর মহাসচিব আলমগীর হোসেন বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেছেন, বর্তমানে ডলারের সংকট না থাকায় বিনিময় হার না বাড়ানোর জন্য বলেছি। টাকার মান যেন আর না কমানো হয়। গভর্নর আমাদের বলেছেন, দেশে ডলারের কোনো অভাব নেই। এক্সচেঞ্জ রেট বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। কেউ যদি বাড়িয়ে দেয় তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, রপ্তানিকারকদের সহায়তায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে গঠিত ইডিএফ তহবিল একসময় ৭ বিলিয়ন ডলার থাকলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ২ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষ থেকে এ তহবিল পাঁচ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার দাবি জানানো হয়েছে। গভর্নর এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে ধাপে ধাপে তহবিল বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন।

সুদের হার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সুদের হার স্থিতিশীল রাখা জরুরি। একই সঙ্গে তা পর্যায়ক্রমে এক অঙ্কে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে বলা হয়, সরকারি খাতে ঋণবৃদ্ধির চাপ কমিয়ে উৎপাদনমুখী খাতে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ব্যবসায় খরচ বেড়ে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি, ব্যবসায়ীদের নীতি-সহায়তা দিতে।’ সভায় ৫ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করার বিষয়টিও আলোচনা হয় জানিয়ে আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমরা বলেছি আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতা ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য। ব্যাংকিং খাতে যে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা ছিল তা ঠিক করা দরকার। একক গ্রাহক ঋণসীমা তুলে দেওয়ার দাবি তুলে এফবিসিসিআইর পক্ষ থেকে বলা হয়, এখন তো ব্যবসার খরচ অনেক বেড়ে গিয়েছে। তাই সীমাটি বাড়িয়ে দেওয়া দরকার।’

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘রপ্তানিকারকদের সহায়তা করতে পণ্য জাহাজীকরণের সময় একটি ঋণ নেওয়ার সুযোগ ছিল। সেটি এখন বন্ধ করা হয়েছে, আমরা বলেছি-সেটি চালু করতে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিনিয়োগ পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জের মুখে চলে গেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এখন ব্যবসায়ীদের নীতি-সহায়তা দিতে হবে। তাহলে ব্যবসা সচল থাকবে। অর্থনীতি সচল হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে।’

তিনি বলেন, তিন মাস কেউ ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে তাকে খেলাপি করা হয়। সেটা বাড়িয়ে ছয় মাস করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এক প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে অন্য প্রতিষ্ঠান খেলাপি হয়ে যায়, সেটা বন্ধ করতে বলেছি। এ ছাড়া ঋণ পুনঃতফসিল দেওয়ার পর সময় ৪ থেকে ৫ বছর দেওয়া হয়, তা বৃদ্ধি করে ১০ বছর করার দাবি জানানো হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগ ও উৎপাদন ধরে রাখতে জরুরি নীতিগত সমর্থন প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। 

বৈঠকে জ্বালানি ব্যয় কমাতে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কম সুদে ঋণ–সুবিধা চালুর সুপারিশ করে এফবিসিসিআই। ব্যবসায়ীদের অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ বাড়াতে সুদ কমানো, ডলার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় সুদের হার কমিয়ে এক অঙ্কে নামানো, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় জ্বালানি ও কাঁচামালের উচ্চমূল্য এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শিল্প খাতের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় ঋণের সুবিধা বাড়ানো, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, পুনঃতফসিলকরণ এবং প্রণোদনা প্যাকেজ কার্যকর করা।

ঢাকা চেম্বার সভাপতি বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করতে নীতিগত সুদের হার ক্রমান্বয়ে কমানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাত, রপ্তানিমুখী শিল্প এবং এসএমই খাতের মতো অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকিযুক্ত ঋণসুবিধা চালু করতে হবে। 

ডিসিসিআই সভাপতি আরও বলেন, ঋণ গ্রহণ ও ঋণ দেওয়ার সুদের হারের মধ্যে বড় ব্যবধানের কারণে ৫ শতাংশের বেশি স্প্রেড রেট বিদ্যমান রয়েছে, যা ব্যাংকিং খাতে বিশেষ করে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে এবং সেই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগে নিম্নমুখী প্রবণতা সৃষ্টি করেছে। 

দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শক্তিশালী সুশাসন নিশ্চিতের বিষয়ে ডিসিসিআই সভাপতি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালা ৯ মাস থেকে ৩ মাসে নামিয়ে আনা, ব্যবসা পরিচালনায় উচ্চ ব্যয়, জ্বালানিসংকট এবং কম চাহিদার মতো সমস্যায় থাকায় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রকৃত (অনিচ্ছাকৃত) খেলাপিদের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা পুনর্বিবেচনা করার পাশাপাশি ঋণ শ্রেণিকরণের সময়সীমা কমপক্ষে ৬ মাস পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেন তাসকীন আহমেদ। 

এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতি বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পণ্য, সেবা ও রপ্তানি বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং এ অবস্থা উত্তরণে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের কোনো বিকল্প নেই, বিশেষ করে দেশের সিএসএমই খাত ও কৃষি ব্যবস্থাপনা ওপর অধিকহারে গুরুত্বারোপ করতে হবে, যার মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আসবে ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।’

দেশে দীর্ঘসময় ধরে বজায় থাকা উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য লজিস্টিক ও পণ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যয়ের উচ্চহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা নিরসনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। 

গভর্নর আরও বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আশাব্যঞ্জক না হওয়ায় আমরা বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণসহ স্থানীয় বিনিয়োগ সম্প্রসারণেও পিছিয়ে রয়েছি। এ অবস্থা উত্তরণে ব্যবসা-বাণিজ্যবিষয়ক নীতিমালার সংস্কারের পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালন ব্যয় হ্রাসের কোনো বিকল্প নেই।      

ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরাসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

[Disclaimer: You may visit the news source-www.khaborerkagoj.com]

অনুরূপ সংবাদ
- Advertisment -

আরও খবর