Beta Ver. 0.04
Thursday, September 17, 2026
Homeজাতীয়‘যদি মেরে ফেলেন আব্বার সঙ্গে দেখা হবে, ছেড়ে দিলে আম্মার সঙ্গে’

‘যদি মেরে ফেলেন আব্বার সঙ্গে দেখা হবে, ছেড়ে দিলে আম্মার সঙ্গে’

জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার বা জেআইসিতে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জবানবন্দি দিয়েছেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী। সাক্ষ্যে নিজে গুম হওয়ার ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।

গুমের এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ আসামির বিরুদ্ধে প্রথম দিনের সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল সোমবার (১৯ জানুয়ারি); আর প্রথম সাক্ষী হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে হুম্মামের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

২০১৬ সালের ৪ আগস্ট তাকে গুম করা হয়। শুধুমাত্র বিএনপি করার কারণে বারবার নির্যাতন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। নির্যাতনে তার সারা শরীরে ঘায়ের মতো হয়ে যেতো। পায়ের অংশে বড় ফোঁড়াও হয়। আয়নাঘরে রাখা টেবিলের নিচের অংশে লাল কালি দিয়ে সিটিআইবি দেখা দেখতে পেয়েছিলেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী। দিন গুনতেন খাবার দেখে। খাবারের জন্য রুটি এলে বুঝতে পারতেন দিন শুরু হয়েছে। কেননা দুপুর ও রাতের খাবার দেওয়া হতো ভাত-মাছ অথবা মুরগি-সবজি। প্রথম দুই মাস একটি পেরেকে দেয়ালে দাগ দিয়ে দিনের হিসাব রাখতেন তিনি।

জবানবন্দিতে হুম্মাম বলেন, ফোঁড়া হওয়ার পর ভেবেছিলাম আমাকে হাসপাতালে নেওয়া হবে। এতে কেউ আমাকে দেখে চিনতে পারবেন। কিন্তু তারা নেয়নি। বেশকিছুদিন পর ফোঁড়ার কারণে হাঁটতে পারছিলাম না। চিৎকার, চেঁচামেচি করে ডাক্তার ডাকতে বলি। তখন একজন ডাক্তার এসে আমাকে পরীক্ষা করেন। আমি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বললে বলা হয় ‘একজন বড় ডাক্তার এসে চিকিৎসা করবেন’। পরদিন আমার সেলে কয়েকজন এসে আমাকে চৌকির সঙ্গে বেঁধে ফেলেন। একপর্যায়ে আমার ফোঁড়া অপারেশন করা হয়। এতে আমি বেঁহুশ হয়ে পড়ি। জ্ঞান ফিরলে মেঝেতে রক্ত, ভেজা গজ, টিস্যু পড়ে থাকতে দেখি। আমাকে এন্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। ওষুধের মোড়ক খুলে হাতে করে নিয়ে আসা হতো। একদিন একজন ভুল করে মোড়কসহ একপাতা ওষুধ নিয়ে আসেন। সেখানে লেখা ছিল ‘ভিআইপি-১’। তা দেখে আমি বুঝতে পারি যে, এটা আমার কোড নেম।

তিনি বলেন, আমাকে মাঝে মধ্যেই নির্যাতন করা হতো। বেশকিছু সময় তারা আমার সেলে এসে আমার হাতে ইনজেকশন দিতো। যার ফলে মনে হতো আমার পুরো শরীরে যেন আগুন ধরে গেছে। বার বার ইনজেকশন দেওয়ার কারণে আমার হাত কালো হয়ে গিয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের সময় বাবার রাজনীতির বিষয়ে জানতে চাইতো। আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করি কি না বা বিদেশি কোনো গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ আছে কি না তা বারবার জিজ্ঞাসা করতো। আমার বিপরীত দিকের সেলে একজন বন্দির কোরআন তেলওয়াতের আওয়াজ ও খাবারের পর শব্দ করে ঢেকুর তোলার শব্দ প্রতিদিন শুনতে পেতাম। তার কান্নার আওয়াজও অনেক দিন শুনেছি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জানতে পারি ওই কোরআন তেলাওয়াতকারী লোকটির নাম ব্রিগেডিয়ার আমান আযমী। তখন বুঝতে পারি এ ভবনে আমি একা নই, আরও বন্দি রয়েছেন। আমার সেলে দুই স্তরের দরজা ছিল। একটি লোহার বার ও আরেকটি স্টিলের। একদিন স্টিলের দরজার কিছু অংশ ফাঁকা থাকায় একজন ব্যক্তিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখি। তাকে জমটুপি পরানো ছিল। তবে জমটুপির নিচে তার দাঁড়ি দেখা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিলো তিনি একজন বয়স্ক ব্যক্তি।

হুম্মাম বলেন, আমার সেলের ভেতরে একটি টিউবলাইট ও একটি সিলিং ফ্যান ছিল। লাইটটি সবসময় জ্বলতো। বন্ধ করার কোনো সুযোগ ছিল না, যা ছিল নির্যাতনের অংশ। একদিন আমাকে যখন ইন্টারোগেশন সেলে মারধর করা হচ্ছিল তখন আমার চোখের বাঁধন সরে গেলে দেখতে পাই যে কক্ষে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল সে কক্ষটি পুরোপুরি সাউন্ডপ্রুফ। চারপাশের দেয়ালে খয়েরি রংয়ের ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে কার্ডবোর্ডের মতো কভার দিয়ে ঢাকা। কক্ষটি প্রথমে অনেক বড় মনে হলেও চোখের বাঁধন খুলে যাওয়ার পর দেখলাম অনেক ছোট। সেখানে থাকা অবস্থায় কোনো বন্দির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি। তবে যারা আমার দেখভাল বা খাবার দিতে আসতেন, তাদের বারবার প্রশ্ন ও কথা বলার চেষ্টা করতাম। তারা কখনও কোনো প্রশ্নের জবাব দিতেন না। তবে যখন আমি আমার কোডনেম জানতে পারি, তখন যিনি খাবার নিয়ে আসেন তাকে ভালো মানের খাবার পরিবেশন করতে বলেছিলাম। তখন তার বড় ভাইকে নিয়ে আসেন। বড় ভাই এসে আমাকে বলল এই ধরনের কথা বললে পরিণতি ভালো হবে না।

জিজ্ঞেস করা হলো কীভাবে জানলাম আমার কোডনেম ভিআইপি-১। আমি বাধ্য হয়ে বলে দেই যে, আমি ওষুধের মোড়কে এ লেখা দেখতে পেয়েছি। যে ব্যক্তি ওই সময় আমার খাবার পরিবেশন করেছিল ঘটনার পর আর আমাকে খাবার দিতে আসেনি। যারা খাবার দিতে আসতো তারা ছিল ছোট ভাই। মেজো ভাইয়েরা মাঝে মাঝে চেক করতে আসতো। আর বড় ভাইয়েরা আসতো বড় সমস্যা হলে। এটা ছিল তাদের হায়ারার্কি।

জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, ইন্টারোগেশন সেলে আমাকে যখন শেষবার নেওয়া হয় তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে আমাকে ছেড়ে দিলে সবাইকে কী বলবো। জবাবে বলেছিলাম আপনারা যা বলতে বলবেন তাই বলব। তারা আমাকে শিখিয়ে দিলেন আমি যেন বলি কিছু দুষ্ট লোক আমাকে কিডন্যাপ করেছিল। আমি তাদের কাছ থেকে পালিয়ে এসেছি। আমাকে আরও বলা হয়, ‘অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার আপনাকে একটা সেকেন্ড চান্স দিতে চান’। তখন আমি বুঝতে পারি যে, আমাকে গুম-নির্যাতনের ঘটনার পেছনে শেখ হাসিনার হাত রয়েছে। সেদিন আমাকে আমার সেলে ফেরত নিয়ে যাওয়া হয়। তিনদিন পর ভোরে কিছু লোক আমার সেলে ঢুকে তিন স্তরে চোখ বাঁধা হয়। আমাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে সেল থেকে বের করে একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয়।

 অনেকক্ষণ গাড়ি চলার পর আবারও সেই জিগজ্যাগ অনুভব করতে পারি। ২০ মিনিট গাড়ি চলার পর একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করেন আমি ভয় পাচ্ছি কি না। আমি বলি না। তখন আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করা হয় পাচ্ছি না। জবাবে বলেছিলাম, ‘যদি মেরে ফেলেন তাহলে আব্বার সঙ্গে দেখা হবে, আর যদি ছেড়ে দেন তাহলে আম্মার সঙ্গে দেখা হবে। এরপর অনেকক্ষণ চলার পর গাড়িটা থেমে যায়। একপর্যায়ে আমাকে গাড়ি থেকে নামানো হয়। আমাকে ফুটপাতে বসিয়ে হ্যান্ডকাফ খুলে দেওয়া হয়। তারা আমার চোখের বাঁধন খুলে দিতে দিতে বলে আমি যেন তিন মিনিট চোখ বন্ধ করে রাখি। যদি চোখ খুলি তাহলে সমস্যা হবে।

এরপর গাড়িটির দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ পাই। গাড়িটি চলে যায়। চোখ খুলে গাড়িটিকে চলে যেতে দেখি। পরে ওই রাস্তায় দাঁড়িয়ে এলাকাটি চেনার চেষ্টা করি। একপর্যায়ে বুঝতে পারি আমি ধানমন্ডি ৭/এ এলাকায় আছি। যেটা আমার বাসা থেকে তিন রাস্তা দূরে। আমি হেঁটে হেঁটে বাসার দিকে যেতে থাকি। বাসায় ঢুকতে গেলে দারোয়ান ঢুকতে দেয়নি। আমার ওজন অনেক কমে যাওয়া, দাঁড়ি-চুল লম্বা হয়ে যাওয়ায় সে আমাকে চিনতে পারেনি। আমার বাড়িতে থাকা পোষা কুকুর আমাকে চিনতে পেরেছিল বিধায় দারোয়ান গেট খুলে দেয়। বাড়িতে প্রবেশ করে জানতে পারি আমার আম্মা এ বাসায় থাকেন না। তিনি গুলশানে বড় ভাইয়ের বাসায় থাকেন। গাড়িতে করে গুলশানে বড় ভাইয়ের বাসায় যাই। আম্মার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর জানতে পারি আরও দুজনকে গুম করা হয়েছে। তাদের একজন ব্যারিস্টার আরমান ও ব্রিগ্রেডিয়ার আজমী।

পরবর্তীতে জানতে পারি আমাকে আটকের সময় সিটিআইবির পরিচালক ছিলেন তৌহিদুল ইসলাম। ডিজিএফআইয়ের প্রধান ছিলেন জেনারেল আকবর। ২০১৭ সালের ২ মার্চ আমাকে মুক্তি দেওয়া হয়। ওই সময় ডিজিএফআইয়ের প্রধান ছিলেন জেনারেল আবেদিন।

হুম্মাম বলেন, যারা আমাকে গুম করেছিল, গুমের নির্দেশ দিয়েছিল, আয়নাঘরে আটকে রেখেছিল, নির্যাতন করেছিল আমি তাদের বিচার চাই। শেখ হাসিনা, জেনারেল আকবর, জেনারেল আবেদিন, ব্রিগ্রেডিয়ার তৌহিদুল ইসলাম ও তাদের সহযোগী যারা হুকুমদাতা ছিল এবং সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় যারা যারা অংশগ্রহণ করেছিল তাদের সর্বোচ্চ শান্তি চাই।

 সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তার জেরা হয়নি। জেরার জন্য আসামিপক্ষের আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ২৫ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

[Disclaimer:You may visit the news source-www.dhakapost.com]

অনুরূপ সংবাদ
- Advertisment -

আরও খবর