নতুন তৈরি না করে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকেই যুগোপযোগী করতে হবে
পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তব ও কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা।
পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তব ও কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। কোনো শিক্ষার্থী তার পড়াশোনা শেষ করেই কর্মসংস্থানে যেন প্রবেশ করতে পারে সেই সুযোগ তৈরি করাও অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু যুগোপযোগী পাঠ্যক্রমের অভাব, দক্ষ শিক্ষক সংকট, শ্রেণীকক্ষের অপ্রতুলতাসহ নানা সংকটের কারণে দেশের বিদ্যমান সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলো সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারছে না। ফলে শিক্ষার্থী সংকটের কারণে অনেক আসন ফাঁকা থাকছে। আবার যারা ভর্তি হচ্ছেন তাদের অনেকেই পড়াশোনা শেষ করেও বেকার থাকায় পলিটেকনিকের প্রতি আকর্ষণ কমছে। প্রতি বছরই বাড়ছে বেকারত্ব। বিশ্বের অনেক দেশ কারিগরি শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে গেলেও আমরা সে তুলনায় এখনো পিছিয়ে। কারণ আমরা বাস্তবমুখী শিক্ষায় গুরুত্ব দিইনি। এ পরিস্থিতিতে নতুন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট তৈরি করলে বেকারত্ব বাড়বে। রাষ্ট্রের অর্থেরও অপচয় হবে। বরং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করতে হবে। প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ ও শ্রেণীকক্ষ সংকট নিরসনসহ শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
বাস্তবমুখী পাঠ্যক্রম না থাকাসহ নানা জটিলতায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর প্রতি শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ কমছে। দেশে বর্তমানে সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ৪১টি। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুসারে, ৩৪টি ডিগ্রির অধীনে ৩৪৬টি টেকনোলজি বা ট্রেড কিংবা স্পেশালাইজেশনে (বিভাগ) শিক্ষার্থী ভর্তি করছে সরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এসব বিভাগে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে মোট আসন ছিল ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮৯৫টি। এর বিপরীতে ভর্তি হয় ৯৮ হাজার ৪৬ শিক্ষার্থী। ওই শিক্ষাবর্ষে ৫৬ হাজার ৮৪৯টি আসনই ফাঁকা থাকে।
জনসংখ্যাকে দক্ষ ও কর্মক্ষম মানবসম্পদে রূপান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণকে লক্ষ্য রেখে ‘২৩টি জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। শুরুতে এ প্রকল্পের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত। দুই দফা মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে নতুন প্রকল্প নিয়ে শিক্ষাবিদদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বিদ্যমান কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট সমাধান না করে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুধুই দৃশ্যমান উন্নয়ন। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির যে লক্ষ্য তা থেকে দূরে সরে গিয়ে নতুন করে বেকারত্ব তৈরি করবে। অথচ বিশ্বের অন্য অনেক দেশ এগিয়েছে কারিগরি শিক্ষা দিয়ে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়নের মূলে কারিগরি শিক্ষা। সেই অবস্থান থেকে বাংলাদেশ এখনো অনেক দূরে। ফলে সঠিক নীতি ও পরিকল্পনার অভাবে কারিগরি শিক্ষায় বাংলাদেশ প্রয়োজনের তুলনায় এগোতে পারছে না।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে ন্যানো টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, রোবোটিকস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, ইন্টারনেট অব থিংস, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ব্লকচেইন টেকনোলজিসহ আধুনিক বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু দেশের কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রম রয়ে গেছে এখনো সেকেলে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রমকে নিয়মিত আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করা হয় না। আবার যারা পাঠ্যক্রম নিয়ে কাজ করেন তাদের সক্ষমতা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। পাঠ্যক্রম নিয়ে দক্ষতা না থাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা ও আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঠ্যক্রম তৈরি করতে পারছেন না। বাস্তব ও কর্মমুখী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোয় দক্ষ শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি কর্মমুখী পাঠ্যক্রম প্রণয়নে গুরুত্ব দেয়া উচিত।
যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুর ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সংখ্যা বাড়ানো ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ফলে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোয় দক্ষ শিক্ষক, ল্যাবরেটরি সংকটসহ নানা সংকটের কারণে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা যাচ্ছে না। যার কারণে ডিগ্রি নিয়েও অনেকেই বেকার জীবন যাপন করছেন। এরা সমাজ ও পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের অভাব ও বেকারত্বের কারণে পলিটেকনিকে পড়তে অনেকেই নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। কাগজে-কলমে কারিগরি শিক্ষার অনেক প্রতিষ্ঠান থাকলেও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে না পারায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় বিদেশী কর্মী নিয়োগ করা হচ্ছে। শিক্ষাজীবনে শিক্ষার্থীরা নানা সংকটের কারণে কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা প্রমাণে ব্যর্থ হচ্ছেন। এতে বিদ্যমান পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অর্থের যেমন অপচয় হচ্ছে, তেমনি বিদেশী কর্মীরা দেশ থেকে প্রচুর অর্থ নিয়ে যাচ্ছে।
দেশের বিদ্যমান পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর যেসব সংকট রয়েছে সেগুলো সমাধানে সরকারসহ অংশীজনদের গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন করে কোনো পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট তৈরি না করে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে উদ্যোগ নেয়া উচিত। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও বাস্তবমুখী দক্ষ জনশক্তি গঠনে যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন ও শিক্ষক সংকট নিরসনে পদক্ষেপ নেয়া হোক, যাতে শিক্ষার্থীরা দক্ষতার ভিত্তিতে শিল্প খাতে অবদান রাখতে পারে। শিক্ষা সম্পন্ন করে কোনো শিক্ষার্থীকে যদি বেকার বসে থাকতে হয় তখন সে শিক্ষার প্রতি আকর্ষণ কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। এ খাতের প্রতি শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ বাড়াতে ইন্টার্নশিপ করার সুযোগসহ কর্মসংস্থানে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত।
[ Disclaimer: You may visit the news source:- https://bonikbarta.com/]

