মাকেও মিছিলে যেতে বলেছিলেন রাকিব
ঝামেলার ভয়ে মামলা করেনি পরিবার
আব্দুল হামিদ
গত ১৮ জুলাই রাজধানীর রামপুরায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নিয়ে ছররা গুলিতে আহত হন রাকিব হোসেন (২৩)। রাতে বাসায় ফিরে রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদের ঢলে পড়ার ভিডিও দেখেন। পরদিন দুপুরে আবার যান মিছিলে। এদিন রামপুরায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন রাকিব। ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়।
সম্প্রতি আফতাবনগরের আনন্দনগর ভুয়াবাড়ির সার্জেন্ট টাওয়ারে কথা হয় রাকিবের মা হাসি আক্তারের সঙ্গে। ছেলে হারানোর শোকে পাথর তিনি। থাকেন ভবনের চার তলার একটি ফ্ল্যাটে। বাসাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে রাকিবের নানা জিনিসপত্র। হাসি আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলে ছিল চতুর্থ শ্রেণি পাস। সরকারি চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। তবুও কেন আন্দোলনে গেল, তা বুঝতে পারছি না।’
রাকিব কাজ করতেন আফতাবনগর বিদ্যুৎ অফিসে, আউটসোর্সিং শ্রমিক হিসেবে। বিয়ে করেন বছর পাঁচেক আগে। সন্তান নেই। শখ করে বাসায় একটি বিড়াল এনেছিলেন। কাজ থেকে বাসায় ফেরার পর ওই বিড়াল নিয়েই পড়ে থাকতেন। হাসি আক্তার জানান, রাকিবের মৃত্যুর পর বিড়ালটি ঠিকমতো খাচ্ছে না। রাকিবের ছবি দেখালে ছোটাছুটি আর কান্নাকাটি করে।
১৯ জুলাই রাকিব গুলিবিদ্ধ হন আফতাবনগর আবাসিক এলাকার গেটে। সেখান থেকে মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলে। তিন দিন পর পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করে পুলিশ। কান্না থামিয়ে হাসি আক্তার বলেন, ‘রাকিব আমাকেও আন্দোলনে যেতে বলেছিল। ওর কথা শুনে আমি যদি সেদিন মিছিলে যেতাম, তাহলে আজ হয়তো মা-ছেলে একত্রে থাকতাম। ওরে ছাড়া বাকি জীবন কেমনে কাটাব?’
হাসি আক্তারও কাজ করেন আফতাবনগর বিদ্যুৎ অফিসে। সারাদিন মা-ছেলে একসঙ্গেই থাকতেন। ঘটনার দিন দুপুরে রাকিব গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পান মা। অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার সময় ছেলের সঙ্গেই ছিলেন। হাসপাতালে পৌঁছার পরপরই রাকিবের মৃত্যু হয়। হাসি আক্তার জানান, রাকিবের পেটে গুলি লেগেছিল। আর আগের দিন ছররা গুলি লেগেছিল পিঠ ও দুই হাতে। আহত অবস্থায় বাসায় ফিরে রাতে মোবাইলে ফোনে রংপুরের আবু সাঈদকে গুলি করার সেই ভিডিও দেখেন তাঁর ছেলে। হাসি আক্তার বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষ, কোনো রাজনীতি করি না। ঝামেলায় পড়ার ভয়ে মামলাও করিনি। বাকি জীবন ছেলের স্মৃতি নিয়ে বাঁচতে চাই, কোনো ঝামেলায় পড়তে চাই না।’
দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে রাকিব ছিলেন সবার বড়। গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কুমারভোগ গ্রামে। সন্তানরা সবাই যখন ছোট, তখন স্বামী চাঁন মিয়ার সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় হাসি আক্তারের। তার পর সন্তানদের নিয়ে আফতাবনগরে থাকতে শুরু করেন এই মা। কষ্ট করে বড় করেন ছেলেমেয়েদের। পরিবারের হাল ধরতে চাকরি নেন বিদ্যুৎ অফিসে।
রাকিবের বোন রূপা আক্তার জানান, তাঁর ভাই বিয়ে করার পর আলাদা বাসা নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বাসায় বেশিদিন ছিলেন না, চলে আসেন মায়ের কাছে। ভাইয়ের মৃত্যুর ২০ দিন আগে বাবার বাড়ি যান তাঁর ভাবি। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি আর আসেননি। রাকিবকে দাফন করা হয়েছে ঝালকাঠি সদরের গাভা রামচন্দ্রপুরে, নানার বাড়িতে।
[ Disclaimer: You may visit the news source- https://samakal.com//]

